আগরতলা: রাজ্যের ক্রীড়া পরিকাঠামোকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার পাশাপাশি প্রতিভাবান খেলোয়াড়দের উপযুক্ত প্রশিক্ষণ, সুযোগ-সুবিধা ও আর্থিক সহায়তা প্রদানের মাধ্যমে ত্রিপুরাকে ক্রীড়া ক্ষেত্রে আরও এগিয়ে নিয়ে যেতে রাজ্য সরকার বদ্ধপরিকর। খেলাধুলার প্রসারের মধ্য দিয়ে সুস্থ, শৃঙ্খলাবদ্ধ ও মাদকমুক্ত সমাজ গড়ে তোলার উপরও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
জাতীয় ক্রীড়া দিবস উপলক্ষে আজ বাধারঘাটস্থিত দশরথ দেব স্টেট স্পোর্টস কমপ্লেক্সে আয়োজিত অনুষ্ঠানে একথা বলেন মুখ্যমন্ত্রী প্রফেসর ডাঃ মানিক সাহা।
মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ত্রিপুরার ক্রীড়া পরিকাঠামো আজ শুধু উত্তর-পূর্বাঞ্চলেই নয়, সারা দেশের মধ্যে দৃষ্টান্ত হয়ে উঠছে। রাজ্যের খেলোয়াড়দের বিশ্বমানের সুযোগ-সুবিধা প্রদান এবং একটি সুস্থ, মাদকমুক্ত সমাজ গড়ে তুলতে রাজ্য সরকার বদ্ধপরিকর। তিনি বলেন, বর্তমান রাজ্য সরকার খেলাধুলাকে শুধুমাত্র প্রতিযোগিতার বিষয় হিসেবে দেখছে না, বরং যুবসমাজের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ, শৃঙ্খলা এবং ভবিষ্যৎ গঠনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করছে।
হকির জাদুকর মেজর ধ্যানচাঁদের জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে জাতীয় ক্রীড়া দিবসের তাৎপর্য তুলে ধরে মুখ্যমন্ত্রী তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। মেজর ধ্যানচাঁদের জীবন ও ক্রীড়া সাধনার কথা স্মরণ করে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যেও কঠোর পরিশ্রম, অধ্যবসায় ও আত্মনিবেদনের মাধ্যমে তিনি বিশ্ব ক্রীড়াঙ্গনে ভারতের গৌরব প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তাঁর জীবন ও আদর্শ বর্তমান প্রজন্মের খেলোয়াড়দের কাছে অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।
মুখ্যমন্ত্রী বলেন, রাজ্যের কৃতি খেলোয়াড় ও ক্রীড়া ব্যক্তিত্বদের যথাযথ সম্মান দেওয়ার ক্ষেত্রে সরকার বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। তাঁদের অবদানকে স্মরণীয় করে রাখতে বিভিন্ন ক্রীড়া পরিকাঠামোর নামকরণও করা হচ্ছে। বাধারঘাটের সিন্থেটিক অ্যাথলেটিক ট্র্যাক প্রখ্যাত অ্যাথলিট দেবভক্তি জমাতিয়া-র নামে, হকি গ্রাউন্ড প্রখ্যাত কোচ স্বদেশপ্রিয় নন্দী-র নামে, খোয়াইয়ের একটি মাঠ প্রতুল ভট্টাচার্য-র নামে, পানিসাগরের সিন্থেটিক ট্র্যাক জাতীয় অ্যাথলেটিক্স কোচ ড. অরুণাভ রায়-এর নামে, ধর্মনগরের ইনডোর হল ব্যাডমিন্টন তারকা গৌরী শেখর রায়-এর নামে এবং আমবাসার স্পোর্টস হোস্টেল জিমন্যাস্ট মধুসূদন সাহা-র নামে নামাঙ্কিত করা হয়েছে।
ডাঃ সাহা বলেন, খেলোয়াড়দের রাজনীতি দিয়ে নয়, তাঁদের কৃতিত্ব দিয়ে বিচার করা বর্তমান সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি। রাজ্যের ক্রীড়া প্রতিভাকে যথাযথ স্বীকৃতি ও সম্মান দেওয়ার পাশাপাশি তাঁদের আরও এগিয়ে যাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান করা হচ্ছে বলেনও মুখ্যমন্ত্রী জানান। রাজ্যের ক্রীড়া পরিকাঠামোর উন্নয়নের বিভিন্ন দিক তুলে ধরে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ইতিমধ্যে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে একাধিক সিন্থেটিক ফুটবল টার্ফ নির্মাণ করা হয়েছে। উমাকান্ত একাডেমি মাঠে আধুনিক ফ্লাডলাইট স্থাপন করা হয়েছে। নরসিংগড়ে আন্তর্জাতিক মানের ক্রিকেট স্টেডিয়াম নির্মাণের কাজ চলছে। বাধারঘাটে প্রায় ৩০ হাজার দর্শক আসন বিশিষ্ট গ্যালারি নির্মাণের পরিকল্পনাও গ্রহণ করা হয়েছে। পাশাপাশি বাধারঘাট, কৈলাশহর ও উদয়পুরে আধুনিক স্পোর্টস হোস্টেল ও যুব আবাস নির্মাণের কাজ এগিয়ে চলছে।
খেলোয়াড়দের আর্থিক সহায়তার প্রসঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্তরে সাফল্য অর্জনকারী খেলোয়াড়দের উৎসাহিত করতে সরকার আর্থিক পুরস্কারের ব্যবস্থা করেছে। সম্প্রতি জুডোতে কমনওয়েলথ গেমস চ্যাম্পিয়ন অস্মিতা দে-কে রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে আর্থিক সহায়তা ও জমি প্রদান করে সম্মানিত করার কথাও তিনি উল্লেখ করেন। তাঁর মতে, সীমিত আর্থিক সামর্থ্যের মধ্যেও অস্মিতার সাফল্য রাজ্যের যুবসমাজের অদম্য ইচ্ছাশক্তির প্রতীক।
মুখ্যমন্ত্রী বলেন, খেলাধুলা শুধু শরীরচর্চা নয়, এটি মানুষের মন, চরিত্র ও শৃঙ্খলাবোধ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তিনি আগামী প্রজন্মকে মাদক থেকে দূরে থেকে বই পড়া ও খেলাধুলার সঙ্গে যুক্ত হওয়ার আহ্বান জানান। "সুস্থ দেহ, সুস্থ মন"-এই চেতনায় যুবসমাজকে গড়ে তুলতে পারলে মাদকমুক্ত ও শক্তিশালী ত্রিপুরা গড়ে তোলা সম্ভব হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। নিজের ক্রীড়া জীবনের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, রাজ্যের প্রতিটি প্রান্তের যুবক-যুবতীকে খেলাধুলার সঙ্গে যুক্ত করার জন্য সরকার ধারাবাহিকভাবে উদ্যোগ গ্রহণ করছে। রাজ্যের সামগ্রিক উন্নয়নের প্রসঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, নীতি আয়োগের বিভিন্ন মূল্যায়নে ত্রিপুরা 'ফ্রন্ট রানার স্টেট' হিসেবে উঠে এসেছে। অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রের পাশাপাশি পর্যটন ও ক্রীড়া ক্ষেত্রেও রাজ্য দ্রুত এগিয়ে চলেছে। আগামী দিনে আন্তর্জাতিক মানের ক্রীড়া প্রতিযোগিতা আয়োজনের উপযোগী পরিকাঠামো গড়ে তোলার লক্ষ্যে সরকার কাজ করছে।
অনুষ্ঠানে বিশিষ্ট অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন যুব বিষয়ক ও ক্রীড়া মন্ত্রী টিঙ্কু রায়, বিধায়ক মিনা রানি সরকার, মেজর ধ্যানচাঁদের পুত্র, অলিম্পিয়ান ও অর্জুন পুরস্কারপ্রাপ্ত অশোক কুমার সিংঅর্জুন পুরস্কারপ্রাপ্ত জিমন্যাস্ট মন্টু দেবনাথ, যুব বিষয়ক ও ক্রীড়া দপ্তরের সচিব তাপস রায়, ক্রীড়া অধিকর্তা এল. ডারলং সহ ক্রীড়া ক্ষেত্রের অন্যান্য বিশিষ্ট ব্যক্তিগণ। অনুষ্ঠানের শুরুতে মুখ্যমন্ত্রী মেজর ধ্যানচাঁদের একটি মূর্তির আবরণ উন্মোচন করেন। উপস্থিত অতিথিরা মেজর ধ্যানচাঁদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। অনুষ্ঠানে ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্তরে ত্রিপুরার জন্য গৌরব বয়ে আনা কৃতি খেলোয়াড় ও বিশিষ্ট প্রশিক্ষকদের সংবর্ধিত করা হয়। মুখ্যমন্ত্রী, ক্রীড়ামন্ত্রী, অলিম্পিয়ান ও অর্জুন পুরস্কারপ্রাপ্ত অশোক কুমার সিং সহ অন্যান্য অতিথিরা খেলোয়াড় ও প্রশিক্ষকদের হাতে সম্মাননা এবং আর্থিক পুরস্কারের চেক তুলে দেন।
অনুষ্ঠান শেষে মুখ্যমন্ত্রী সহ উপস্থিত অতিথিগণ মঞ্চ সংলগ্ন সিন্থেটিক হকি মাঠ এবং দেবভক্তি জমাতিয়া সিন্থেটিক অ্যাথলেটিক ট্র্যাক পরিদর্শন করেন। মাঠে খেলোয়াড়দের সঙ্গে মতবিনিময় করেন এবং তাঁদের উৎসাহিত করেন। মুখ্যমন্ত্রী খেলোয়াড়দের সঙ্গে করমর্দন করে তাঁদের শুভেচ্ছা জানান এবং ভবিষ্যতে আরও বড় সাফল্য অর্জনের জন্য উৎসাহ প্রদান করেন।
