আগরতলা : রাজ্যে শান্তি ও স্থিতিশীলতা জোরদারের পথে এক গুরুত্বপূর্ণ সাফল্যের চিত্র তুলে ধরেছেন মুখ্যমন্ত্রী।
মঙ্গলবার বিধানসভায় মুখ্যমন্ত্রী ডাক্তার মানিক সাহা জানান, ১ এপ্রিল ২০২৩ থেকে এ পর্যন্ত বিভিন্ন নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠনের মোট ১,২৪৫ জন সদস্য আত্মসমর্পণ করে সমাজের মূলস্রোতে ফিরে এসেছেন। আত্মসমর্পণের সময় তাঁরা মোট ১৪৭টি অস্ত্র জমা দিয়েছেন—যা রাজ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতির একটি বড় সূচক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। সোমবার বিধানসভা অধিবেশন চলাকালীন বিরোধী দলনেতা জিতেন্দ্র চৌধুরী-র উত্থাপিত প্রশ্নের লিখিত জবাবে মঙ্গলবার এই তথ্য প্রকাশ করা হয়।
সরকারিভাবে জানানো হয়, আত্মসমর্পণকারীদের মধ্যে সর্বাধিক সংখ্যক ক্যাডার এসেছে এনএলএফটি -এর বিভিন্ন গোষ্ঠী থেকে। এনএলএফটি (বিশ্বমোহন গোষ্ঠী)-এর ৪১৭ জন ক্যাডার আত্মসমর্পণ করেছেন, যাঁদের মধ্যে এই গোষ্ঠীর স্বঘোষিত প্রধান বিশ্বমোহন দেববর্মাও রয়েছেন। এনএলএফটি (পরিমল দেববর্মা গোষ্ঠী)-এর ৩৯৪ জন সদস্য অস্ত্র ত্যাগ করেছেন। এনএলএফটি (ও আর আই গোষ্ঠী)-এর ২২৩ জন ক্যাডার শান্তি প্রক্রিয়ায় যোগ দিয়েছেন। পাশাপাশি এটিটিএফ-এর ২২০ জন জঙ্গিও আত্মসমর্পণ করেছেন।
আত্মসমর্পণের সময় জমা পড়া ১৪৭টি অস্ত্রের মধ্যে অধিকাংশই ছিল দেশীয়ভাবে তৈরি আগ্নেয়াস্ত্র। উদ্ধার হওয়া অস্ত্রের তালিকায় রয়েছে ৯৩টি দেশি বন্দুক, ১৩টি একে-সিরিজ রাইফেল, ২টি কারবাইন, ৬টি .৩০৩ রাইফেল, ৪টি চীনা রাইফেল, ১টি চীনা পিস্তল, ১টি সিএম স্টেনগান, ৮টি পিস্তল, ৪টি রিভলভার, ৮টি এক-নলা বন্দুক, ১টি বোতাম্যাক্স যন্ত্র, ৪টি চীনা গ্রেনেড এবং কিছু এয়ারগান। মুখ্যমন্ত্রী বিধানসভায় আরও জানান, নির্দিষ্ট সময়সীমার পর থেকে রাজ্যে নতুন করে কোনো জঙ্গি কার্যকলাপের খবর পাওয়া যায়নি।
এই পরিস্থিতিকে তিনি রাজ্যের আইনশৃঙ্খলার উল্লেখযোগ্য উন্নতি হিসেবে তুলে ধরেন। বিশ্লেষকদের মতে, এই ধারাবাহিক আত্মসমর্পণ রাজ্যে দীর্ঘদিনের সশস্ত্র আন্দোলনের অবসানের দিকে এক বড় পদক্ষেপ। সরকার স্পষ্ট করে জানিয়েছে, ভারত সরকার এবং জঙ্গি সংগঠনগুলোর মধ্যে স্বাক্ষরিত পুনর্বাসন চুক্তি অনুযায়ী—এনএলএফটি এবং এটিটিএফ-এর সদস্যদের সম্পূর্ণভাবে অস্ত্র ও সহিংসতা পরিত্যাগ করতে হবে। চুক্তির মূল শর্তগুলোর মধ্যে রয়েছে, সমস্ত অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক,সহিংসতা ও গোপন কার্যকলাপ সম্পূর্ণভাবে ত্যাগ, এক মাসের মধ্যে সশস্ত্র কার্যকলাপ বন্ধ করা ,ভারতের সংবিধান মেনে চলা এবং সামাজিক সম্প্রীতি বজায় রাখা, ভবিষ্যতে কোনো জঙ্গি গোষ্ঠীকে সহায়তা, প্রশিক্ষণ বা অস্ত্র সরবরাহে সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা, চুক্তি স্বাক্ষরের পর কোনো সদস্যের কাছে অস্ত্র পাওয়া গেলে তা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে বলেও জানানো হয়েছে।
রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলের মতে, সাম্প্রতিক এই আত্মসমর্পণের ঢেউ ত্রিপুরার দীর্ঘদিনের অশান্ত অতীত থেকে বেরিয়ে আসার একটি ইতিবাচক ইঙ্গিত বহন করছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, পুনর্বাসন নীতি সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে প্রাক্তন জঙ্গিদের সমাজে পুনঃস্থাপন সহজ হবে এবং রাজ্যে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার পথ আরও সুগম হবে।
তবে এই সাফল্যের ধারাকে ধরে রাখতে পুনর্বাসন প্রক্রিয়ার কার্যকর বাস্তবায়ন এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করাই এখন সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করা হচ্ছে।
