আগরতলা: উন্নয়নের জন্য সাধারণ মানুষের কাছে অঙ্গীকারবদ্ধ বর্তমান সরকার। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নির্দেশিত পথেই আজ দ্রুতগতিতে উন্নয়নের লক্ষ্যে এগিয়ে যাচ্ছে ত্রিপুরা। ২০৪৭ সালের মধ্যে ‘বিকশিত ভারত’ গড়ে তোলার যে লক্ষ্য প্রধানমন্ত্রী রেখেছেন, সেই লক্ষ্যপূরণেই রাজ্য সরকার নিরলসভাবে কাজ করে চলেছে।

আজ উত্তর ত্রিপুরা জেলার ধর্মনগরে নবনির্মিত জেলাশাসক ও সমাহর্তার কার্যালয়ের দ্বারোদ্ঘাটন করে একথা বলেন মুখ্যমন্ত্রী প্রফেসর ডাঃ মানিক সাহা। এদিন মুখ্যমন্ত্রীর হাত ধরে ভার্চুয়ালি এছাড়াও ১৭৬ কোটি টাকা মূল্যের ৫০টি প্রকল্পের উদ্বোধন ও ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করা হয়।

অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রী আরও বলেন, উন্নয়নের জন্য সাধারণ মানুষের কাছে বর্তমান সরকার যে অঙ্গীকারবদ্ধ ছিল, এই উন্নয়নমূলক প্রকল্পগুলির বাস্তবায়ন তারই প্রতিফলন। এই প্রকল্পগুলির মাধ্যমেই মানুষের কাছে দেওয়া প্রতিশ্রুতি আজ বাস্তবে রূপায়িত হচ্ছে। রাজ্যের প্রতিটি প্রান্তে যে উন্নয়নের কর্মযজ্ঞ চলছে, তার সুফল আজ উত্তর ত্রিপুরা জেলার মানুষের কাছেও পৌঁছে গেছে।

মুখ্যমন্ত্রী বলেন, আগে শুধু স্বর্ণযুগের কথা শোনা যেত, কিন্তু বর্তমান সরকার কথায় নয়, কাজে বিশ্বাসী- রাজ্যে এখন চলছে প্রকৃত কর্মযোগ। বর্তমান সরকার রাজ্যের উন্নয়নমূলক কাজ করছে। শুধুমাত্র উত্তর ত্রিপুরা জেলায় নয়, বর্তমান রাজ্য সরকার ত্রিপুরার প্রতিটি প্রান্তের সম উন্নয়ন নিশ্চিত করছে। চলতি বছরেই ১,০০০ কোটি টাকারও বেশি ব্যয়ে বিভিন্ন প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন ও উদ্বোধন করা হয়েছে। উত্তর ত্রিপুরা জেলার উন্নয়নের অঙ্গনেও এই নতুন জেলাশাসক কার্যালয় স্থাপনের মাধ্যমে এবং ১৭৬ কোটি টাকার যে বিভিন্ন প্রকল্প উদ্বোধন ও শিলান্যাস হয়ে গেল, তার মধ্য দিয়ে এক নতুন আশার সঞ্চার হয়েছে এই জেলার মানুষের কাছে। মুখ্যমন্ত্রী আরও বলেন যে, বর্তমান রাজ্য সরকার প্রধানমন্ত্রীর মার্গদর্শনে ‘সবকা সাথ, সবকা বিকাশ, সবকা বিশ্বাস ও সবকা প্রয়াস’ এই মূল নীতিকে পাথেয় করে প্রতিটি মানুষের কল্যাণে কাজ করছে।

শুধু পরিকাঠামোগত উন্নয়ন নয়, সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন এবং তাদের সরকারের বিভিন্ন জনকল্যাণমুখী প্রকল্পের আওতায় নিয়ে এসে সরাসরি সুবিধা প্রদান করাই রাজ্য সরকারের প্রধান লক্ষ্য। বর্তমান সরকার গঠনের পর থেকেই গ্রামীণ এলাকায় কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে ‘ত্রিপুরা গ্রামীণ জীবিকা মিশন’-এর মাধ্যমে ধারাবাহিকভাবে একাধিক প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। রাজ্যের যুবসমাজকে সঠিক দিশা দেখাতে এবং একটি নেশামুক্ত ত্রিপুরা গড়ে তুলতে রাজ্য সরকার জিরো টলারেন্স পলিসি গ্রহণ করেছে বলে জানান মুখ্যমন্ত্রী।

অনুষ্ঠানে ডাঃ সাহা বলেন, রাজ্যজুড়ে ক্রীড়া পরিকাঠামোর অভূতপূর্ব প্রসার ঘটানো হচ্ছে, যাতে যুব সমাজ খেলাধুলার প্রতি উৎসাহিত হয় এবং নেশাজাতীয় বস্তু থেকে দূরে থাকে। কৃতি ক্রীড়াবিদদের যথাযথ সম্মান জানাতে তাঁদের নামে বিভিন্ন ক্রীড়া পরিকাঠামো উৎসর্গ করা হচ্ছে। ধর্মনগরেও ৬ কোটি ৮০ লক্ষ টাকা ব্যয়ে নির্মিত ‘গৌরীশঙ্কর রায় ইনডোর স্পোর্টস হল’-এর কথা তিনি উল্লেখ করেন।

স্বাস্থ্য ব্যবস্থার কথা তুলে ধরে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সময়ে ত্রিপুরায় স্বাস্থ্যক্ষেত্রে অভূতপূর্ব অগ্রগতি হয়েছে। রাজ্যে এখন আধুনিক ও জটিল চিকিৎসার সুব্যবস্থা রয়েছে, যার ফলে চিকিৎসার জন্য রোগীদের বাইরের রাজ্যে রেফার করার হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে এসেছে। তিনি আরও জানান, রাজ্যে উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় থাকার ফলে দেশ ও বিদেশের বিনিয়োগকারীরা ত্রিপুরায় বিনিয়োগ করতে ব্যাপক আগ্রহ প্রকাশ করছেন। অতি সম্প্রতি আগরতলায় অনুষ্ঠিত ‘ত্রিপুরা বিজনেস কনক্লেভ’-এ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আশাতীত প্রতিনিধি অংশ নিয়েছেন, যা রাজ্যের অর্থনৈতিক সম্ভাবনার এক উজ্জ্বল চিত্র তুলে ধরে।

উত্তর ত্রিপুরা জেলার পরিকাঠামোগত উন্নয়ন ও জাতীয় স্তরে বিভিন্ন ক্ষেত্রে উত্তর ত্রিপুরা জেলার কাজের স্বীকৃতি সমূহ তুলে ধরেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, সড়ক যোগাযোগ ক্ষেত্রে জেলায় উন্নত যাতায়াত ব্যবস্থা গড়ে তুলতে ২৯৬ কোটি টাকা ব্যয়ে প্রায় ২৮০ কিমি প্রধান সড়ক সংস্কার ও নতুন রাস্তা নির্মাণ করা হচ্ছে। উত্তর ত্রিপুরা জেলায় দীর্ঘদিনের ক্র পুনর্বাসন সমস্যার স্থায়ী সমাধানে ৬৪ কোটি টাকা ব্যয় করে সফলভাবে তাদের পুনর্বাসন নিশ্চিত করা হয়েছে। পিএম জনমন প্রকল্পে ২০২৬ সালে উত্তর ত্রিপুরা জেলা সমগ্র দেশের মধ্যে ‘সেরা পারফর্মিং জেলা’ হিসেবে শীর্ষস্থান অর্জন করেছে। জল সঞ্চয় জন ভাগীদারী প্রকল্পে উত্তর-পূর্বাঞ্চল ও পাহাড়ি রাজ্যগুলির ক্যাটাগরিতে উত্তর ত্রিপুরা জেলা ‘সেরা পারফর্মিং জেলা’ হিসেবে বিশেষ পুরষ্কার লাভ করেছে। উত্তর ত্রিপুরার ভাংমুন দেশের প্রথম গ্রাম হিসেবে পরিগণিত হয়েছে, যার প্রতিটি বাড়ি এবং সরকারি ভবনে রেইন ওয়াটার হার্ভেস্টিং ব্যবস্থা সুনিশ্চিত করা হয়েছে। যা প্রধানমন্ত্রীর ‘মন কী বাত’ অনুষ্ঠানেও প্রশংসিত হয়েছে।

এদিন উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বিধায়ক যাদব লাল দেবনাথ, বিধায়ক জহর চক্রবর্তী, বিধায়ক বিনয় ভূষণ দাস, ধর্মনগর পুর পরিষদের চেয়ারপার্সন মিতালি রাণী দাস সেন, তথ্য ও সংস্কৃতি দপ্তরের সচিব কিরণ গিত্যে, বিদ্যুৎ দপ্তরের সচিব অভিষেক সিং, বিদ্যালয় শিক্ষা দপ্তরের সচিব মিলিন্দ রামটেকে, উত্তর ত্রিপুরা জেলার জেলা শাসক চাঁদনী চন্দ্রন, উত্তর ত্রিপুরা জেলার পুলিশ সুপার অবিনাশ রায়। উল্লেখ্য, নবনির্মিত এই জেলাশাসক কার্যালয়টি জি প্লাস থ্রি, বিল্ডিং। মোট প্লিন্থ এরিয়া ১,৭৫০ বর্গমিটার। অফিসে রুম রয়েছে ৪৯টি। এছাড়া রয়েছে একটি কনফারেন্স হল, একটি মিটিং হল, একটি ভিডিও কনফারেন্স হল। ভবনটি নির্মাণে মোট ব্যয় হয়েছে ২২ কোটি ১০ লক্ষ ৫৫৬ টাকা।

পাশাপাশি অনুষ্ঠানে ধর্মনগর পুরপরিষদের অধীন আটজনের হাতে ওয়ার্ড সেক্রেটারি পদের নিয়োগপত্র তুলে দেওয়া হয়। মুখ্যমন্ত্রী এই নিয়োগপত্রগুলি চাকরি প্রাপকদের হাতে তুলে দেন। প্রতিটি শিশুর শিক্ষাকে নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে, জেলার বিভিন্ন বিদ্যালয়ের গৃহীত একটি অভিনব কর্মসূচি হর হাত হুনার এর ভিত্তিতে জেলার তিনটি বিদ্যালয়কে পুরস্কৃত করা হয়। প্রথম পুরস্কার পায় বড়ুয়াকান্দি দ্বাদশ শ্রেণি বিদ্যালয়, দ্বিতীয় পুরস্কার বড়গোল উচ্চবিদ্যালয় এবং তৃতীয় পুরস্কার ক্ষুদ্রাকান্দি উচ্চ বিদ্যালয়। এছাড়া অনুষ্ঠানে উত্তর ত্রিপুরা জেলার সাথে টাটা ট্রাস্টের একটি মৌ স্বাক্ষরিত হয়। গ্রামীণ উন্নয়ন, পানীয়জল ও স্বাস্থ্যবিধি ও গ্রামীণ জীবিকা নির্বাহের ক্ষেত্রে উন্নয়নমূলক কাজ করার জন্য এই মৌ স্বাক্ষরিত হয়। জেলার বিভিন্ন ব্লকে স্বচ্ছতার জন্য স্বচ্ছতা ভেহিকেল পরিষেবা চালু করা হয়। মুখ্যমন্ত্রী সবুজ পতাকা দেখিয়ে এই ভেহিকেলগুলির আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু করেন।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *