আগরতলা: রাজ্যের প্রতিটি নাগরিকের কাছে উন্নত ও আধুনিক চিকিৎসা পরিষেবা পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে স্বাস্থ্য পরিকাঠামো সম্প্রসারণের পাশাপাশি চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে রাজ্য সরকার। স্বাস্থ্য পরিষেবার মানোন্নয়ন এবং চিকিৎসকের ঘাটতি দূর করে রাজ্যকে চিকিৎসা ক্ষেত্রে আরও স্বয়ংসম্পূর্ণ করে তোলাই রাজ্য সরকারের অন্যতম লক্ষ্য।
আজ প্রজ্ঞাভবনে জেনারেল ডিউটি মেডিক্যাল অফিসার (জিডিএমও)-দের নিয়োগপত্র প্রদান এবং দন্ত চিকিৎসক ও কমিউনিটি হেলথ অফিসারদের (সিএইচও) প্রশিক্ষণ কর্মসূচির উদ্বোধন করে একথা বলেন মুখ্যমন্ত্রী প্রফেসর ডাঃ মানিক সাহা। অনুষ্ঠানে মুখ্যমন্ত্রী তথা স্বাস্থ্যমন্ত্রী ডাঃ সাহা বলেন, রাজ্যের স্বাস্থ্য পরিষেবার আমূল পরিবর্তন এবং প্রতিটি নাগরিকের কাছে আধুনিক চিকিৎসা পরিষেবা পৌঁছে দেওয়া শুধু প্রতিশ্রুতি নয়, এটি বর্তমান সরকারের অন্যতম দায়িত্ব।
এই সরকার কথায় নয়, কাজে বিশ্বাসী। আজকের এই নিয়োগ ও প্রশিক্ষণ কর্মসূচি সেই ধারাবাহিক প্রয়াসেরই একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত বলে তিনি উল্লেখ করেন। অনুষ্ঠানে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, রাজ্যের স্বাস্থ্য দপ্তরে শূন্যপদ পূরণে দ্রুততার সঙ্গে কাজ করছে সরকার। টিপিএসসির মাধ্যমে শূন্যপদ পূরণের প্রক্রিয়া শুরু করা হয়েছে। এর ফলে রাজ্যের গ্রামীণ ও প্রান্তিক এলাকায় স্বাস্থ্য পরিষেবা আরও শক্তিশালী হবে বলে মুখ্যমন্ত্রী অভিমত ব্যক্ত করেন। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, বর্তমানে স্বচ্ছতা ও মেধার ভিত্তিতেই সরকারি নিয়োগ প্রক্রিয়া পরিচালিত হচ্ছে। যোগ্যতার ভিত্তিতে যুবসমাজ যাতে তাঁদের প্রাপ্য সুযোগ পায়, সেই লক্ষ্যে সরকার কাজ করছে। তিনি বলেন, সরকারি চাকরিতে নিয়োগের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা বজায় রাখার পাশাপাশি স্বাস্থ্য পরিষেবায় প্রয়োজনীয় সংখ্যক চিকিৎসক নিয়োগের উপরও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
নবনিযুক্ত চিকিৎসকদের উদ্দেশে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, চিকিৎসক পেশা শুধু একটি চাকরি নয়, এটি মানুষের জীবন ও স্বাস্থ্যের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত একটি মহান দায়িত্ব। রোগীদের সঙ্গে সহমর্মিতা ও মানবিক আচরণের উপর চিকিৎসকদের বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ রোগীদের সঙ্গে চিকিৎসকদের ব্যবহার এবং সহমর্মিতা অনেক সময় ওষুধের চেয়েও বেশি কাজ করে। সরকারি চিকিৎসক হিসেবে দায়িত্ব পালনের অর্থ হল মানুষের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করা। প্রতিটি রোগীকে নিজের পরিবারের সদস্যের মতো গুরুত্ব দিয়ে চিকিৎসা পরিষেবা দেওয়ার জন্য তিনি নবনিযুক্ত চিকিৎসকদের প্রতি আহ্বান জানান। চিকিৎসকদের নিয়মিত জ্ঞানচর্চার পাশাপাশি আধুনিক প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং নতুন চিকিৎসা পদ্ধতির সঙ্গে নিজেদের আপডেট রাখার উপরও মুখ্যমন্ত্রী গুরুত্ব আরোপ করেন।
অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে রাজ্য সরকারের বিভিন্ন সাফল্যের কথা তুলে ধরে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, রাজ্যে ইতিমধ্যেই সফলভাবে ৯ জনের কিডনি প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। আগামীদিনে হার্ট ও লিভার প্রতিস্থাপন পরিষেবা চালু করার লক্ষ্যেও সরকার উদ্যোগ নিয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী জন আরোগ্য যোজনার আওতায় রাজ্যের ১০০ শতাংশ মানুষকে স্বাস্থ্য বিমার আওতায় আনা হয়েছে। পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী জন আরোগ্য যোজনার কাজও সফলতার সঙ্গে এগিয়ে চলেছে। চিকিৎসা শিক্ষার ক্ষেত্রেও রাজ্যের অগ্রগতির কথা উল্লেখ করে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, দেশের ৮২৩টি মেডিক্যাল কলেজের মধ্যে আগরতলা সরকারি মেডিক্যাল কলেজ ১৩১তম স্থান অর্জন করেছে। পাশাপাশি ই-সঞ্জীবনী ও আভা কার্ডের মাধ্যমে ডিজিটাল স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করা হচ্ছে। আগরতলার কাসারি পট্টিতে চালু হওয়া ৫০ শয্যা বিশিষ্ট ডা. শ্যামা প্রাসাদ মুখার্জী সিভিল হাসপাতালে ইন্টিগ্রেটেড হেলথ ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেম (IHIMS) রাজ্যের ডিজিটাল স্বাস্থ্য পরিষেবার মানোন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেবে বলে তিনি জানান। স্বাস্থ্য পরিকাঠামোর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তুলে ধরে মুখ্যমন্ত্রী জানান, গতকাল আমবাসায় মেডিক্যাল কলেজ স্থাপনের জন্য ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন ও ভূমি পূজা হয়েছে। রাজ্যে একটি পৃথক হেলথ ইউনিভার্সিটি গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
মুখ্যমন্ত্রী আরো বলেন, উদয়পুরের টেপানিয়াতে আয়ুর্বেদিক এবং রানীরবাজারে হোমিওপ্যাথিক মেডিক্যাল কলেজ চালুর পরিকল্পনাও রয়েছে। আগরতলা ডেন্টাল কলেজকে উৎকর্ষ কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে কাজ এগিয়ে চলেছে। জিরানিয়া, মোহনপুর ও উদয়পুরের মহকুমা হাসপাতালগুলির আধুনিকীকরণ এবং ট্রমা কেয়ার সেন্টার স্থাপনের কাজও চলছে। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, রাজ্যের সামগ্রিক বাজেট বৃদ্ধি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে স্বাস্থ্য ক্ষেত্রেও বিনিয়োগ ও পরিকাঠামো উন্নয়নের সুযোগ বেড়েছে। স্বাস্থ্য পরিষেবাকে আরও জনমুখী ও আধুনিক করে তুলতে রাজ্য সরকার ধারাবাহিকভাবে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করছে। সাধারণ মানুষের কষ্ট লাঘবে জিবি হাসপাতালে স্বল্পমূল্যে দুপুরের আহার এবং রোগীদের পরিজনদের জন্য ভারতমাতা ক্যানটিন ও শেল্টার হাউস চালু করা হয়েছে। যা বর্তমান রাজ্য সরকারের মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন।
অনুষ্ঠানে বিশিষ্ট অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন স্বাস্থ্য দপ্তরের সচিব কিরণ গিত্যে, স্বাস্থ্য দপ্তরের অধিকর্তা ডাঃ দেবাশ্রী দেববর্মা, মেডিকেল এডুকেশনের ইনচার্জ প্রফেসর ডাঃ অভিজিত দত্ত, আইডিএর ত্রিপুরা শাখার সভাপতি ডাঃ অমিত লাল গোস্বামী, পরিবার কল্যাণ ও রোগ প্রতিরোধ দপ্তরের অধিকর্তা ডাঃ অঞ্জন দাস সহ অন্যান্য বিশিষ্ট চিকিৎসকগণ। উল্লেখ্য, অনুষ্ঠানে ৪২ জন জেনারেল ডিউটি মেডিক্যাল অফিসারদের (জিডিএমও) মধ্যে প্রতীকী হিসেবে কয়েকজন জিডিএমও-এর হাতে নিয়োগপত্র তুলে দেন মুখ্যমন্ত্রী। অনুষ্ঠানে ন্যাশনাল ওরাল হেলথ-এর উদ্যোগে সারা বছরব্যাপী কর্মসূচির উপর একটি তথ্যচিত্র প্রদর্শন করা হয়। এছাড়াও ‘স্বাস্থ্য সংবাদ’ স্মরণিকার আবরণ উন্মোচন করেন মুখ্যমন্ত্রী সহ উপস্থিত অতিথিগণ।
