আগরতলা : ত্রিপুরা বিধানসভায় মঙ্গলবার রাজ্যের বিভিন্ন দপ্তরে বিপুল সংখ্যক শূন্যপদ নিয়ে বিস্তৃত ও তীব্র বিতর্কের সৃষ্টি হয়। ‘জিরো আওয়ার’-এ বিষয়টি উত্থাপন করে বিরোধী দল একের পর এক প্রশ্নের মাধ্যমে সরকারের নিয়োগ নীতি ও প্রশাসনিক কার্যকারিতা নিয়ে সরব হয়।
পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে, মুখ্যমন্ত্রী ডাক্তার মানিক সাহা নিজেই লিখিত জবাবে স্বীকার করেন—রাজ্যের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরে হাজার হাজার পদ এখনও খালি পড়ে রয়েছে এবং গত কয়েক বছরে সেই শূন্যপদ পূরণে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি হয়নি।বিরোধী দলনেতা জিতেন্দ্র চৌধুরী , কংগ্রেস বিধায়ক সুদীপ রায় বর্মন এবং নয়ন সরকার সহ অন্যান্য সদস্যরা বিষয়টি উত্থাপন করে সরকারের উপর তীব্র চাপ সৃষ্টি করেন। তাঁদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্থবিরতা বিরাজ করছে, যার ফলে প্রশাসনিক কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়ছে এবং জনসেবা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
বিধানসভায় পেশ করা তথ্য অনুযায়ী, রাজ্যের স্বরাষ্ট্র দপ্তরে পরিস্থিতি সবচেয়ে উদ্বেগজনক। ৫ মার্চ, ২০২৬-এর হিসাব অনুযায়ী, পুলিশ সুপার থেকে শুরু করে কনস্টেবল স্তর পর্যন্ত মোট ৬,৭৪৩টি পদ শূন্য রয়েছে। অথচ গত তিন বছরে মাত্র ১,৪৮৫টি নিয়োগ সম্পন্ন হয়েছে। এই বিপুল ঘাটতির ফলে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ব্যবস্থার উপর চাপ ক্রমশ বাড়ছে বলে মত বিশ্লেষকদের। সরকার ২০২৪ সালে ২১৮ জন সাব-ইন্সপেক্টর নিয়োগের ঘোষণা করলেও, এখনও পর্যন্ত টিপিএসসি কোনো নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেনি।
এতে চাকরিপ্রার্থীদের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা বাড়ছে। অনেক প্রার্থীই আশঙ্কা করছেন, দীর্ঘসূত্রিতার কারণে তারা বয়সসীমা অতিক্রম করে সুযোগ হারাতে পারেন। শুধু স্বরাষ্ট্র দপ্তর নয়, সরকারের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিভাগেও একই চিত্র পরিলক্ষিত হয়েছে। সাধারণ প্রশাসন দপ্তরে মোট ৫৯৫টি পদ শূন্য, যার মধ্যে গ্রুপ-বি বিভাগের ৪৯টি পদ অন্তর্ভুক্ত। উল্লেখযোগ্যভাবে, গত তিন বছরে এই বিভাগে কোনো নিয়োগ হয়নি।গণপূর্ত বিভাগ পিডব্লিউডি-এ পরিস্থিতি আরও জটিল। এখানে মোট ৩,৫৯৯টি পদ খালি পড়ে রয়েছে, যার মধ্যে মুখ্য প্রকৌশলী ও তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিগত পদও রয়েছে। পিডব্লিউডি-র অধীনস্থ পানীয় জল শাখায় ৫৪৩টি পদ শূন্য, যা জনস্বাস্থ্য পরিষেবার উপর সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে। এছাড়াও স্বরাষ্ট্র দপ্তরের অধীনস্থ কারা বিভাগে ৮৩৯টি পদ খালি রয়েছে, যা কারাগার পরিচালনা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থায় গুরুতর প্রভাব ফেলছে বলে অভিযোগ।
বিরোধী সদস্যরা দাবি করেন, ২০২২ সালের পর থেকে ত্রিপুরা সিভিল সার্ভিস টিসিএস এবং ত্রিপুরা পুলিশ সার্ভিস টিপিএস-এর কোনো পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়নি। একইভাবে ত্রিপুরা বন পরিষেবার শেষ পরীক্ষা হয় ২০১৯-২০ সালে। ২০২০ সালের পর থেকে গ্রুপ-সি ও গ্রুপ-ডি পদে নিয়োগ কার্যত বন্ধ রয়েছে এবং ইঞ্জিনিয়ারিং সার্ভিস পরীক্ষাগুলিও দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে আছে।
তাদের মতে, এই পরিস্থিতি প্রমাণ করে যে সরকারের নিয়োগ প্রক্রিয়া কাঠামোগতভাবে স্থবির হয়ে পড়েছে এবং এতে প্রশাসনিক দক্ষতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বিরোধী দল আরও অভিযোগ করে যে, ২০১৮ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে ৫০ হাজার শূন্য পদ পূরণের যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, তা আজও বাস্তবায়িত হয়নি। পাশাপাশি অনিয়মিত কর্মীদের নিয়মিতকরণ নিয়েও কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি বলে তাদের দাবি। তারা আরও উল্লেখ করেন, পূর্ববর্তী বামফ্রন্ট সরকারের সময় কর্মীদের নিয়মিতকরণের যে নীতিমালা ছিল, বর্তমান সরকার তা বাতিল করেছে—যার ফলে কর্মীদের মধ্যে অসন্তোষ বাড়ছে।
এই প্রেক্ষাপটে মুখ্যমন্ত্রী ডা. মানিক সাহা জানান, নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করে সংশ্লিষ্ট সংস্থা—বিশেষত টিপিএসসি—এর উপর। প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন না হলে সরকার একতরফাভাবে নিয়োগ করতে পারে না বলেও তিনি স্পষ্ট করেন। তবে তাঁর এই মন্তব্য বিরোধীদের সন্তুষ্ট করতে পারেনি। বরং তারা অভিযোগ করেন, সরকার দায় এড়ানোর চেষ্টা করছে এবং নিয়োগ প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করার ক্ষেত্রে কার্যকর উদ্যোগ নিচ্ছে না। রাজ্যের ক্রমবর্ধমান বেকারত্বের প্রেক্ষাপটে এই শূন্যপদের সমস্যা আরও গুরুতর হয়ে উঠেছে। হাজার হাজার পদ খালি থাকা সত্ত্বেও নিয়োগ প্রক্রিয়ায় বিলম্ব হওয়ায় যুব সমাজের মধ্যে ক্ষোভ ও অনিশ্চয়তা বাড়ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিস্থিতি শুধু প্রশাসনিক কাঠামোকেই দুর্বল করছে না, বরং রাজ্যের সামগ্রিক উন্নয়নকেও প্রভাবিত করছে। অবকাঠামো উন্নয়ন, জনস্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং আইন-শৃঙ্খলা—সব ক্ষেত্রেই জনবলের ঘাটতি বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে শূন্যপদের বিশাল জট এবং নিয়োগ প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রিতা রাজ্য সরকারের জন্য একটি বড় প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। পর্যবেক্ষকদের মতে, এই ইস্যু আগামী দিনে রাজ্যের রাজনীতিতে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে এবং সরকারের ওপর চাপ ক্রমশ বাড়তে পারে।
এখন দেখার বিষয়, সরকার কত দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিয়ে এই সংকট কাটিয়ে উঠতে পারে এবং রাজ্যের যুব সমাজের প্রত্যাশা পূরণ করতে সক্ষম হয়।
