আগরতলা: রাজ্যে উচ্চমূল্যের উন্নত জাতের আম উৎপাদনে স্বনির্ভরতা অর্জনের লক্ষ্যে রাজ্য উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্র (State Horticulture Research Station – SHRS) একটি ‘এক্সোটিক ম্যাঙ্গো ব্লক’ স্থাপন করেছে। এর মাধ্যমে বিভিন্ন বিদেশি ও উন্নত আমের জাতের কর্মক্ষমতা, অভিযোজন ক্ষমতা এবং ফলন সম্ভাবনা মূল্যায়ন করা হবে।
শুক্রবার নাগিছড়ায় অবস্থিত এসএইচআরএস-এ ফল ও সবজি উন্নয়ন ইউনিটের নতুন অফিস ভবনের উদ্বোধন অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে এ তথ্য জানান কৃষি ও কৃষক কল্যাণ মন্ত্রী রতন লাল নাথ।মন্ত্রী জানান, ইয়েলো বানানা, ডক-মাই, রেড পামার, বারি-৪, ব্রুনেই কিং, হারিভাঙা, কাটিমন, থাই-১ রেডসহ বিভিন্ন উচ্চমূল্যের উন্নত আমের জাত নিয়ে এই বিশেষ ব্লক গড়ে তোলা হয়েছে।
এর উদ্দেশ্য হলো ত্রিপুরার জলবায়ু ও কৃষি-পরিবেশে এসব জাতের উপযোগিতা যাচাই করা এবং ভবিষ্যতে মানসম্পন্ন চারা উৎপাদন ও সম্প্রসারণের ভিত্তি তৈরি করা।তিনি বলেন, রাজ্য উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্র ত্রিপুরার অন্যতম প্রধান গবেষণা প্রতিষ্ঠান। এখানে ফল, সবজি, নারকেল, সুপারি, কাজুবাদাম, মসলা ও সুগন্ধি ফসল, আলু (এআরসি ও আইপিএস প্রযুক্তি), মাশরুম, টিস্যু কালচার এবং ম্যাক্রো-প্রোপাগেশনসহ বিভিন্ন উদ্যান ফসল নিয়ে কৌশলগত ও প্রয়োগভিত্তিক গবেষণা পরিচালিত হয়।
মন্ত্রী আরও জানান, প্রতিষ্ঠানটি শুরুতে নারকেল, সুপারি, তেলপাম, কাজুবাদাম, গোলমরিচ ও কলার বিভিন্ন জার্মপ্লাজম সংগ্রহ ও সংরক্ষণের মাধ্যমে যাত্রা শুরু করেছিল।ফল উন্নয়ন ইউনিটের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা তুলে মন্ত্রী জানান প্রায় ১৫ হেক্টর এলাকাজুড়ে বিস্তৃত ফল উন্নয়ন ইউনিটে দেশি ও বিদেশি নানা প্রজাতির ফলের সমৃদ্ধ সংগ্রহ রয়েছে। এটি রাজ্যের উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা ও উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে।এই ইউনিটের প্রধান লক্ষ্যসমূহ হলো ত্রিপুরার উপযোগী উচ্চফলনশীল, জলবায়ু সহনশীল ও বাজারমুখী দেশি-বিদেশি ফলের জাত সংগ্রহ, মূল্যায়ন ও জনপ্রিয়করণ, বিভিন্ন ফলের জার্মপ্লাজম সংরক্ষণ ও অভিযোজন ক্ষমতা যাচাই করে রাজ্যের জন্য সর্বোত্তম জাত নির্বাচন এবং ফল উৎপাদনের উৎপাদনশীলতা, গুণগত মান, স্থায়িত্ব ও লাভজনকতা বৃদ্ধির জন্য আধুনিক প্রযুক্তির উদ্ভাবন ও উন্নয়ন।
তিনি জানান, শীতকালীন স্ট্রবেরি চাষের বাণিজ্যিক সম্ভাব্যতা যাচাই এবং প্রদর্শনমূলক কার্যক্রমও বর্তমানে পরিচালিত হচ্ছে। সবজি উদ্ভাবন ইউনিটের কার্যক্রম উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন ফল ব্লকের অন্তর্গত সবজি উদ্ভাবন ইউনিট প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে উন্নত সবজি উৎপাদন প্রযুক্তির উন্নয়ন ও সম্প্রসারণের মাধ্যমে রাজ্যের কৃষকদের উৎপাদনশীলতা, লাভজনকতা এবং টেকসই কৃষি ব্যবস্থা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে।এই ইউনিটের অন্যতম লক্ষ্য হলো অফ-সিজন সবজি চাষের প্রসার। বিশেষ করে গ্রীষ্মকালীন ফুলকপি চাষের মতো প্রযুক্তি ক্ষুদ্র, প্রান্তিক ও বাণিজ্যিক কৃষকদের মধ্যে জনপ্রিয় করে তোলা হচ্ছে। ফলে কৃষকরা চাহিদার সময় বাজারে সবজি সরবরাহ করে অধিক মূল্য ও লাভ অর্জন করতে পারছেন।
এছাড়া ত্রিপুরার মূল্যবান দেশীয় জার্মপ্লাজম—যেমন সূরজি ও বার্ডস আই মরিচ এবং শিঙ্গারাঠা বেগুন—সংগ্রহ, সংরক্ষণ, মূল্যায়ন ও গবেষণার মাধ্যমে ভবিষ্যতের উন্নত জাত উদ্ভাবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।মন্ত্রী জানান, প্রচলিত লাল তরমুজের বিকল্প হিসেবে উচ্চমূল্যের হলুদ খোসাযুক্ত তরমুজের চাষ সম্প্রসারণেও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর ফলে কৃষকদের জন্য নতুন বাজার সৃষ্টি হবে এবং আয়ের নতুন সম্ভাবনা উন্মোচিত হবে।
মন্ত্রী বলেন এআরসি প্রযুক্তিতে আলু উৎপাদনে বিপ্লব। ‘বেটার সিড প্রোডাকশন অব পটেটো থ্রু অ্যাপিক্যাল রুটেড কাটিং (ARC) টেকনোলজি’ শীর্ষক প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রীয় কৃষি বিকাশ যোজনা (PM-RKVY) ২০২২-২৩ প্রকল্পের আওতায় ত্রিপুরায় আলুর গড় উৎপাদনশীলতা প্রতি হেক্টরে ৫,৮৮৮ কিলোগ্রামে উন্নীত হয়েছে।
মন্ত্রী জানান, এআরসি প্রযুক্তি গ্রহণের ফলে রাজ্যের পূর্ববর্তী গড় উৎপাদনের তুলনায় প্রায় ৯০ শতাংশ বৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে, যা আলু চাষে এক উল্লেখযোগ্য সাফল্য।গত তিন বছরে (২০২৩-২৪, ২০২৪-২৫ এবং ২০২৫-২৬) কুফরি ময়ন, কুফরি হিমালিনী, কুফরি উদয়, কুফরি লিমা এবং কুফরি থার-১২—এই পাঁচটি জনপ্রিয় আলুর জাতের চাষ শুরু হয়েছে বলেও তিনি জানান।
তিনি বলেন এআরসি প্রযুক্তির মাধ্যমে ২০২৮-২৯ সালের মধ্যে উচ্চমানের আলুবীজ উৎপাদনে সম্পূর্ণ স্বনির্ভর হওয়ার লক্ষ্য নিয়েছে ত্রিপুরা। এর ফলে বাইরের রাজ্যের বীজের ওপর নির্ভরতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাবে।
পাশাপাশি ২০২৯-৩০ সালের মধ্যে Ware Potato উৎপাদনেও পূর্ণ স্বনির্ভরতা অর্জনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে বলে তিনি জানান।
