আগরতলা: মুখ্যমন্ত্রী প্রফেসর ডাঃ মানিক সাহা আজ বলেছেন যে, সক্ষমতা বৃদ্ধি, উদ্যোক্তাদের সচেতন করা এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে ক্যাপিটাল মার্কেটের (পুঁজিবাজার) সুবিধা ব্যবহারে উৎসাহিত করার মাধ্যমে ভারতের আর্থিক বৃদ্ধির খতিয়ানের এক সক্রিয় অংশীদার হওয়ার উপযুক্ত সময় এখন ত্রিপুরার এসেছে, যাতে এই রাজ্য একটি আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী ও সমৃদ্ধ ত্রিপুরা গড়ে তুলতে পারে।

আজ আগরতলার প্রজ্ঞা ভবনে ন্যাশনাল স্টক এক্সচেঞ্জ (NSE) ও সিপার্ড (SIPARD), শিল্প ও বাণিজ্য দপ্তর ও দক্ষতা উন্নয়ন দপ্তরের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক (MoU) স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখার সময় একথা বলেন মুখ্যমন্ত্রী ডাঃ সাহা। অনুষ্ঠানে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক বৃদ্ধির অভিমুখে ত্রিপুরার পথচলায় রাজ্য এখন এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করছে।

তিনি বলেন, “ভারতের সর্ববৃহৎ আর্থিক বিনিময় কেন্দ্র ‘ন্যাশনাল স্টক এক্সচেঞ্জ অব ইন্ডিয়া লিমিটেড’-এর সঙ্গে আমাদের এই চুক্তি ত্রিপুরার যুবসমাজের জন্য আর্থিক সাক্ষরতা, বিনিয়োগকারী সচেতনতা এবং সিকিউরিটিজ মার্কেট বিষয়ক প্রশিক্ষণকে আরও শক্তিশালী করার লক্ষ্যে একটি ঐতিহাসিক পদক্ষেপ। ন্যাশনাল স্টক এক্সচেঞ্জ অব ইন্ডিয়া-র সঙ্গে হাত মেলানোর ক্ষেত্রে সিপার্ড, শিল্প ও বাণিজ্য দপ্তর এবং দক্ষতা উন্নয়ন দপ্তর যে সহযোগিতাপূর্ণ মনোভাব দেখিয়েছে, তার জন্য আমি তাদের প্রশংসনীয় উদ্যোগকে সাধুবাদ জানাই”। তিনি আরও বলেন, দেশের একটি স্বনামধন্য জাতীয় আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে এই যৌথ উদ্যোগ প্রমাণ করে নতুন নতুন অর্থনৈতিক সুযোগ গ্রহণ করতে ত্রিপুরা কতটা প্রস্তুত।

ডাঃ সাহা বলেন, আজকের অর্থনীতি দ্রুত গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে। গত কয়েক বছরে আমরা ছয় বছরের মধ্যে রাজ্যের গ্রস ডোমেস্টিক প্রোডাক্ট (GDP) দ্বিগুণ করেছি। ত্রিপুরার মাথাপিছু আয় এখন জাতীয় গড়ের সমকক্ষে রয়েছে। অর্থনৈতিক বৃদ্ধিকে আরও ত্বরান্বিত করতে রাজ্য সরকার উদ্যোক্তা তৈরি, আর্থিক অন্তর্ভুক্তিকরণ, দক্ষতা উন্নয়ন, বিনিয়োগ প্রচার, বৃহত্তর আর্থিক অংশগ্রহণ এবং ডিজিটাল রূপান্তরের জন্য একটি গতিশীল অর্থনৈতিক পরিবেশ তৈরিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

মুখ্যমন্ত্রী বলেন, সরকারি আধিকারিক, যুবসমাজ, উদ্যোক্তা, এমএসএমই (MSME) এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে আর্থিক বাজার এবং বিনিয়োগের সুযোগ সম্পর্কে আরও গভীর জ্ঞানে সমৃদ্ধ করা অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে। আলোচনায় মুখ্যমন্ত্রী আরো বলেন, আমাদের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বারবার আর্থিক সাক্ষরতার গুরুত্বের ওপর জোর দিয়েছেন, যার সূচনা হয়েছিল ‘প্রধানমন্ত্রী জন ধন যোজনা’ এবং ডিজিটাল লেনদেনের মাধ্যমে।

এখন যুবসমাজের আর্থিক পরিষেবা সংক্রান্ত ক্ষেত্রে প্রবেশ করার মঞ্চ তৈরি হয়ে গেছে। ন্যাশনাল স্টক এক্সচেঞ্জের ১৩ কোটিরও বেশি বিনিয়োগকারী ভিত্তি রয়েছে, যা গত পাঁচ বছর ধরে বার্ষিক ২৬% হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। ন্যাশনাল স্টক এক্সচেঞ্জের প্রচেষ্টাতেই ভারতের ক্যাপিটাল মার্কেট এখন আর কেবল মহানগরগুলোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই।

তিনি বলেন, ব্যাঙ্কিং, আর্থিক পরিষেবা এবং বিমা—যা দেশের অন্যতম দ্রুত বর্ধনশীল কর্মসংস্থান ক্ষেত্র—তা এখন ত্রিপুরার যুবদের দক্ষতা উন্নয়নের জন্য এক নতুন দিগন্ত। ভারতের অর্থনীতি পরিচালিত হচ্ছে তরুণ প্রজন্মের মাধ্যমে।

মুখ্যমন্ত্রী বলেন, প্রধানমন্ত্রী কৌশল বিকাশ যোজনা ৪.০তে আর্থিক পরিষেবা সহ ভবিষ্যতের দক্ষতার উপর জোর দেওয়া হয়েছে। তাই ন্যাশনাল স্টক এক্সচেঞ্জ এবং দক্ষতা উন্নয়ন দপ্তর যৌথভাবে ক্যাপিটাল মার্কেট, মিউচুয়াল ফান্ড, বিমা এবং ইনভেস্টমেন্ট অ্যাডভাইজরি কভার করে একটি পাঠ্যক্রম তৈরি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এনএসই এই প্রোগ্রামের খরচ বহন করবে এবং রাজ্য সরকার কেবল দক্ষতা প্রশিক্ষণের জন্য স্থান বা ভেন্যু প্রদান করবে।

এটি ক্যাপিটাল মার্কেট, মিউচুয়াল ফান্ড এবং বিস্তৃত আর্থিক পরিষেবা খাতে ছাত্র ও যুবদের কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি করবে। কর্মসংস্থান আয় তৈরি করে এবং আর্থিক দক্ষতা সেই আয়কে সম্পদে রূপান্তরিত করে। আমরা রামকৃষ্ণ মিশনের সহযোগিতায় একটি বিদেশি ভাষা শেখার স্কুল খোলার সিদ্ধান্তও নিয়েছি, যাতে আমাদের যুবসমাজ প্রয়োজনে বিদেশের ক্যাপিটাল মার্কেটেও কাজ করার সুযোগ পায়।

মুখ্যমন্ত্রী ডাঃ সাহা জানান, এনএসই এবং সিপার্ড-এর সমঝোতা স্মারকের মাধ্যমে রাজ্যজুড়ে বিনিয়োগকারী শিক্ষা প্রসারের জন্য স্বীকৃত মাস্টার ট্রেইনারদের একটি নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা হবে। শিল্প ও বাণিজ্য দপ্তর এবং এনএসই-র মধ্যেকার এই অংশীদারিত্ব স্থানীয় এমএসএমই, স্টার্টআপ এবং উদ্যোক্তাদের আর্থিক ও ক্যাপিটাল মার্কেটের সুযোগগুলো ব্যবহারের সক্ষমতা দেবে।

মুখ্যমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ ও কৌশলগত আঞ্চলিক উদ্যোগগুলোর সঙ্গে আন্তঃসীমান্ত যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত হওয়ার কারণে ত্রিপুরা এখন এক পরিকাঠামোগত এবং বাণিজ্য সংক্রান্ত পুনর্জাগরণের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে রয়েছে। ব্যবসা সংক্রান্ত সংস্কারের পাশাপাশি বিধিনিষেধ শিথিলকরণ এবং জটিলতা কমানোর ক্ষেত্রে ত্রিপুরা ধারাবাহিকভাবে ভালো পারফর্ম করেছে।

এমএসএমই হলো ত্রিপুরার স্থানীয় অর্থনীতির মূল ভিত্তি, বিশেষ করে কৃষি-প্রক্রিয়া, তাঁত, বাঁশশিল্প, ফসল এবং রাবার উৎপাদনে—যদিও মূলধন বা ঋণ পাওয়া এখনও একটি বড় বাঁধা। শহর থেকে নগরে এবং নগর থেকে গ্রামে ক্যাপিটাল বা মূলধনের প্রবাহ পৌঁছানোর সময় এসে গেছে। ত্রিপুরার জন্য এখন সময় এসেছে ভারতের আর্থিক বৃদ্ধির যাত্রায় এক সক্রিয় অংশীদার হওয়ার। সক্ষমতা বৃদ্ধি, উদ্যোক্তাদের শিক্ষিত করা এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে ক্যাপিটাল মার্কেটের সুবিধা গ্রহণে উৎসাহিত করার মাধ্যমে আমরা একটি আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী ও সমৃদ্ধ ত্রিপুরা গড়ে তুলতে পারি।

অনুষ্ঠানে বিশিষ্ট অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রী সান্তনা চাকমা, মুখ্যসচিব জিতেন্দ্র কুমার সিনহা, সচিব কিরণ গিত্যে ও অপূর্ব রায়, সিপার্ড-এর অধিকর্তা অঙ্কিত শর্মা, এনএসই-র চিফ রেগুলেটরি অফিসার কিষাণ আইয়ার, এনএসই-র সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট (বিজনেস ডেভেলপমেন্ট) এবং বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি ও প্রশাসনের পদস্থ আধিকারিকগণ।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *