আগরতলা: মানুষের জীবনে চোখের গুরুত্ব অপরিসীম। সাধারণ সমস্যা থেকে শুরু করে জটিল ও বিশেষায়িত চক্ষুরোগের চিকিৎসা যাতে রাজ্যের মানুষ নিজের রাজ্যেই পেতে পারেন, সেই লক্ষ্যেই চক্ষু হাসপাতাল গড়ে তোলা হচ্ছে। এখানে শিশুদের চক্ষুরোগেরও বিভিন্ন জটিল সমস্যার চিকিৎসার ব্যবস্থা থাকবে।
আজ আগরতলার ক্যাপিটাল কমপ্লেক্সে আগরতলা সরকারি চক্ষু হাসপাতালের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের পাশাপাশি রাজ্যের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় ইন্টিগ্রেটেড হেলথ ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেম (আই.এইচ.এম.আই.এস.)-এর আনুষ্ঠানিক সূচনা করে একথা বলেন মুখ্যমন্ত্রী প্রফেসর ডাঃ মানিক সাহা।
অনুষ্ঠানে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, আগামী দিনে এই সরকারি চক্ষু হাসপাতালকে শুধু ত্রিপুরার মানুষের উন্নত চক্ষু চিকিৎসার নির্ভরযোগ্য কেন্দ্র হিসেবেই নয়, সমগ্র উত্তর-পূর্ব ভারতের মানুষের জন্য একটি আধুনিক ও উৎকর্ষের চক্ষু চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্য রয়েছে। আজকের এই উদ্যোগ রাজ্যে উন্নত ও আধুনিক চক্ষু চিকিৎসার নতুন পরিকাঠামো গড়ে তোলার পাশাপাশি স্বাস্থ্য পরিষেবাকে আরও সমন্বিত, স্বচ্ছ ও প্রযুক্তি নির্ভর করে তোলার পথে এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।
মুখ্যমন্ত্রী বলেন, এতদিন রাজ্যের মানুষের চোখে জটিল সমস্যা দেখা দিলে উন্নত চিকিৎসার জন্য বহিরাজ্যে যাওয়ার প্রবণতা ছিল। তাই ত্রিপুরাতেই কেন একটি উন্নতমানের টার্শিয়ারি আই হসপিটাল গড়ে উঠবে না, সেই ভাবনা থেকেই এই উদ্যোগ। এই হাসপাতাল গড়ে উঠলে রাজ্যের মানুষ চোখের চিকিৎসার ক্ষেত্রে বিরাট উপকৃত হবে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ‘স্বপ্ন দেখতে এবং সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের’ প্রেরণার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এই হাসপাতালকে আগামীদিনে অত্যাধুনিক প্রযুক্তি নির্ভর সেন্টার অব এক্সিলেন্স ইন অপথালমোলজি হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। তিনি বলেন, আধুনিক বায়োমেডিক্যাল আই-টেকনোলজির পাশাপাশি উন্নত রোগ নির্ণয় ও অস্ত্রোপচার পরিষেবাও থাকবে। এখানে অপারেশন থিয়েটারের ব্যবস্থাও থাকবে। মুখ্যমন্ত্রী হাসপাতালটির নির্মাণ কাজ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সম্পন্ন করার জন্য সংশ্লিষ্টদের প্রতি গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, ভবিষ্যতের প্রয়োজন বিবেচনায় রেখে হাসপাতাল ভবনের আরও সম্প্রসারণের সুযোগও রাখা হচ্ছে।
মুখ্যমন্ত্রী আরও বলেন, আগামী দিনে এই হাসপাতালকে আগরতলা গভর্নমেন্ট মেডিক্যাল কলেজ ও জিবিপি হাসপাতালের চিকিৎসা পরিষেবা এবং একাডেমিক ব্যবস্থার অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনাও রয়েছে। এরফলে চিকিৎসা পরিষেবার পাশাপাশি চিকিৎসা শিক্ষা, ক্লিনিক্যাল প্রশিক্ষণ ও গবেষণার ক্ষেত্রেও নতুন সুযোগ তৈরি হবে। অনুষ্ঠানে রাজ্যের স্বাস্থ্য পরিকাঠামোর সামগ্রিক উন্নয়নের কথা তুলে ধরে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, আগরতলা ছাড়াও জেলা ও মহকুমাস্তরে স্বাস্থ্য পরিষেবার পরিকাঠামো সম্প্রসারণে সরকার গুরুত্ব দিয়েছে। গোমতী, ধলাই ও দক্ষিণ ত্রিপুরা জেলা হাসপাতালে ট্রমা কেয়ার সেন্টার চালু হয়েছে। উত্তর ত্রিপুরা জেলা হাসপাতালেও খুব শীঘ্রই এই পরিষেবা চালু হবে। খোয়াই ও সিপাহীজলায় নতুন জেলা হাসপাতাল নির্মাণের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে এবং গোমতী জেলা হাসপাতালের শয্যা সংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি বাড়ানোর কাজ হয়েছে।
স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উন্নয়নের পরিসংখ্যান তুলে ধরে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, আগরতলা গভর্নমেন্ট মেডিক্যাল কলেজ ও জিবিপি হাসপাতালের শয্যা সংখ্যা ৭২৭ থেকে বেড়ে ১,৪১৩ হয়েছে। রাজ্যে ইতিমধ্যে নয়টি সফল কিডনি প্রতিস্থাপন হয়েছে। ভবিষ্যতে হার্ট ও লিভার প্রতিস্থাপন পরিষেবা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। জিবিপি হাসপাতালে মা ও শিশু স্বাস্থ্য বিভাগের নির্মাণ কাজ চলছে এবং বিলোনীয়াতেও মাতৃ ও শিশু স্বাস্থ্য পরিষেবা সম্প্রসারিত হয়েছে। ফলস্বরূপ বর্তমানে রাজ্য থেকে বহিরাজ্যে রোগী রেফার করার হারও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। স্বাস্থ্য পরিষেবায় ডিজিটাল ব্যবস্থার প্রসঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি আগরতলা সিভিল হাসপাতালে ইতিমধ্যে ডিজিটাল রোগী নিবন্ধন ব্যবস্থা চালু হয়েছে এবং আই.এইচ.এম.আই.এস.-এর মাধ্যমে এই ব্যবস্থাকে আরও বিস্তৃত করা হচ্ছে। আই.এইচ.এম.আই.এস.-এর সঙ্গে হেলথ কমান্ড এণ্ড কন্ট্রোল সেন্টার-কে যুক্ত করার ফলে রাজ্যের বিভিন্ন স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানের পরিষেবা সম্পর্কে রিয়েল-টাইম তথ্য পাওয়া এবং ড্যাশবোর্ডের মাধ্যমে নজরদারি করা সম্ভব হবে। এতে হাসপাতাল পরিচালনার মতো গুরুত্বপূর্ণ পরিষেবাগুলি একটি সমন্বিত ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের আওতায় আসবে।
মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ডিজিটাল স্বাস্থ্য ব্যবস্থায়ও ত্রিপুরা ইতিমধ্যেই উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করেছে। রাজ্যের প্রায় ৮০ শতাংশ মানুষের আভা আইডি তৈরি হয়েছে। সরকারি হাসপাতালে ১৮ লক্ষেরও বেশি স্ক্যান এন্ড শেয়ারের মাধ্যমে রোগীর নাম নথিভুক্ত হয়েছে। টেলি-কনসালটেশন পরিষেবার মাধ্যমে আগরতলা গভর্নমেন্ট মেডিক্যাল কলেজের চিকিৎসকরা দিল্লির এ.আই.আই.এম.এস.-এর বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে পরামর্শ করতে পারছেন। এরফলে রাজ্যের মানুষকে উন্নত চিকিৎসা পরামর্শের জন্য সবসময় বহিরাজ্যে যেতে হচ্ছে না। রাজ্যের স্বাস্থ্য পরিকাঠামোর উন্নয়নের পাশাপাশি চিকিৎসা শিক্ষার ক্ষেত্রেও বিভিন্ন উদ্যোগের কথা তুলে ধরেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, রাজ্যে একটি স্বতন্ত্র স্বাস্থ্য বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়া এগিয়ে চলেছে। ডেন্টাল কলেজ ও নার্সিং কলেজ চালু হয়েছে। আগামী শিক্ষাবর্ষ থেকে হোমিওপ্যাথিক ও আয়ুর্বেদিক মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের পঠন পাঠন শুরু করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সাধারণ মানুষের জন্য স্বাস্থ্য পরিষেবাকে আরও সহজলভ্য করার বিভিন্ন উদ্যোগের কথাও তুলে ধরেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী জন আরোগ্য যোজনা ও মুখ্যমন্ত্রী জন আরোগ্য যোজনার মাধ্যমে লক্ষাধিক মানুষ ক্যাশলেস চিকিৎসার সুবিধা পেয়েছেন। পাশাপাশি ‘মুখ্যমন্ত্রী নিরাময় আরোগ্য অভিযান’-এরও ব্যাপক সাড়া পাওয়া যাচ্ছে। শিশু ও কিশোর কিশোরীদের স্বাস্থ্য সুরক্ষার ক্ষেত্রেও রাজ্য সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের কথা তুলে ধরেন তিনি। তিনি বলেন, সম্পূর্ণ টিকাকরণ কর্মসূচিতে প্রায় ৯০ শতাংশ শিশুকে টিকা দেওয়া হয়েছে। ‘মুখ্যমন্ত্রী সুস্থ শৈশব ও সুস্থ কৈশোর অভিযান’-এর মাধ্যমে ১ থেকে ১৯ বছর বয়সী ১০ লক্ষেরও বেশি শিশু ও কিশোর কিশোরীর কাছে পুষ্টি ও স্বাস্থ্য পরিষেবা পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। রাষ্ট্রীয় বাল স্বাস্থ্য কার্যক্রম (আর.বি.এস.কে.)-এর আওতায় বিপুল সংখ্যক শিশুর স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও চিকিৎসা পরিষেবা দেওয়া হচ্ছে।
মুখ্যমন্ত্রী বলেন, সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্য সুরক্ষাকে অগ্রাধিকার দিয়েই সরকার কাজ করছে। জিবিপি হাসপাতালে রোগীর সহায়কদের জন্য মাত্র ১০ টাকায় দুপুরের খাবারের ব্যবস্থা করা হয়েছে। দূরদুরান্ত থেকে আসা রোগীদের পরিবার পরিজনদের জন্য ১০০ শয্যার নাইট শেল্টারও নির্মাণ করা হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী প্রফেসর ডাঃ মানিক সাহা বলেন, রাজ্যের স্বাস্থ্য পরিষেবার উন্নয়নে সরকারের স্বচ্ছ, ইতিবাচক ও জনকল্যাণমুখী দৃষ্টিভঙ্গির ফলে মানুষের মধ্যে স্বাস্থ্য ব্যবস্থার প্রতি আস্থা আরও সুদৃঢ় হচ্ছে। রাজ্যের মানুষের উন্নততর স্বাস্থ্য পরিষেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে এই হাসপাতাল একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন হয়ে উঠবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
অনুষ্ঠানে আই.এইচ.এম.আই.এস.-এর কার্যপ্রণালী ও এর মাধ্যমে স্বাস্থ্য পরিষেবায় আসতে চলা পরিবর্তন নিয়ে একটি তথ্যচিত্র প্রদর্শন করা হয়। হাসপাতালটির সামগ্রিক রূপ ও আধুনিক পরিষেবা কাঠামোর একটি সুস্পষ্ট চিত্রও তুলে ধরা হয়। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন আগরতলা পুরনিগমের মেয়র তথা বিধায়ক দীপক মজুমদার, স্বাস্থ্য সচিব কিরণ গিত্যে, জাতীয় স্বাস্থ্য মিশন ত্রিপুরার মিশন ডিরেক্টর সাজু বাহিদ এ., চিফ এগজিকিউটিভ অফিসার আগরতলা স্মার্ট সিটি ড. জি. এস. নায়েক, স্বাস্থ্য পরিষেবা দপ্তরের অধিকর্তা ডা. দেবাশ্রী দেববর্মা, পরিবার কল্যাণ ও প্রতিরোধমূলক চিকিৎসা দপ্তরের অধিকর্তা ডা. অঞ্জন দাস, আগরতলা গভর্নমেন্ট মেডিক্যাল কলেজের অধ্যক্ষ ডা. তপন মজুমদার এবং জিবিপি হাসপাতালের মেডিক্যাল সুপার সহ অন্যান্য বিশিষ্ট ব্যক্তিগণ।
