আগরতলা: চতুর্দশ দেবতা বাড়ি আজ ত্রিপুরার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় পর্যটন কেন্দ্র। ঐতিহ্যকে সংরক্ষণ করে উন্নয়নকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে সরকার। ঐতিহ্যবাহী খারচি পুজো এখন জাতি জনজাতি সকল অংশের মানুষের মিলন মেলায় পরিণত হয়েছে।
আজ খয়েরপুরস্থিত ১৪ দেবতা মন্দির প্রাঙ্গণে ৭দিন ব্যাপী ঐতিহ্যবাহী খারচি পুজো ও মেলার সূচনা করে একথা বলেন মুখ্যমন্ত্রী প্রফেসর ডাঃ মানিক সাহা।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রী ডাঃ সাহা বলেন, আজ আমি চতুর্দশ দেবতার চরণে গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করছি এবং সমগ্র ত্রিপুরাবাসীর সুখ শান্তি, সুস্বাস্থ্য, সমৃদ্ধি ও সর্বাঙ্গীণ কল্যাণ কামনা করছি। খারচি পুজোর মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে - পৃথিবী মাতার শুদ্ধিকরণ ও পুণ্য অর্জন করা। খারচি শব্দের উৎপত্তি খা থেকে। অর্থাৎ পৃথিবী থেকে। খারচি পুজো শুধু ধর্মীয় উৎসব নয়, এটা ত্রিপুরার ইতিহাস, সংস্কৃতি, আধ্যাত্মিক চেতনা, সম্প্রীতি ও জাতি জনজাতির সম্মিলিত একটা ঐক্যের উজ্জ্বল প্রতীক। এটা ত্রিপুরার অন্যতম প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী ও সর্বজনীন ধর্মীয় উৎসব। আমরা জানি রাজ পরিবারের কুলদেবতা চতুর্দশ দেবতার আরাধনার মধ্যে এই পুজোর সূচনা হলেও এটা ত্রিপুরার মানুষের সর্বজনীন উৎসবে পরিণত হয়েছে। ১৭০৭ খ্রিস্টাব্দে মহারাজা কৃষ্ণ মানিক্যের শাসন কালে চতুর্দশ দেবতার মন্দির ত্রিপুরার তৎকালীন রাজধানী উদয়পুর থেকে এই পুরাতন আগরতলায় স্থানান্তরিত হয়। এভাবে চতুর্দশ দেবতারাও সেখান থেকে চলে আসেন। পরবর্তী সময়ে রাজধানী আগরতলায় স্থানান্তরিত হলেও পুরান হাভেলির চতুর্দশ দেবতা মন্দিরে খারচি পুজো থেকে যায়।
মুখ্যমন্ত্রী বলেন, প্রতি বছর আষাঢ় মাসের শুক্লা অষ্টমী তিথিতে খারচি পুজো অনুষ্ঠিত হয়। একে সামনে রেখে বিভিন্ন ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান, মেলা ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রমের আয়োজন করা হয়। অনেক আগে হাওড়া নদীর উপর ব্রিজ ছিল না। তাই নৌকায় চেপে আসতে হতো। এতে অনেক দুর্ঘটনাও হতো। কিন্তু এরপরও সারা রাজ্যের মানুষ জাতি ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে এই পুজোয় সামিল হতেন। ৭দিন ব্যাপী এই পুজো ও মেলায় ত্রিপুরা ছাড়াও বিভিন্ন রাজ্য ও দেশ থেকে মানুষ এখানে সমবেত হন। যা একে একটি প্রাণবন্ত মিলন ক্ষেত্র হিসেবে পরিণত করে। রাজমালা থেকে জানা যায় যে চতুর্দশ দেবতারা হচ্ছেন রাজ বংশের কুলদেবতা। খারচি পুজো যারা করেন তাঁরা হচ্ছেন চন্তাই। প্রধান পুরোহিত তথা চন্তাইয়ের নেতৃত্বে এই শতাব্দী প্রাচীন খারচি পুজো যাবতীয় আচার বিধি মেনে অত্যন্ত শ্রদ্ধার সঙ্গে পালন করা হয়। এই চতুর্দশ দেবতারা হচ্ছেন - হর, উমা, হরি, লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক, গণেশ, ব্রম্মা, পৃথিবী, সমুদ্র, গঙ্গা, অগ্নি, কামদেব ও হিমাদ্রি। সারা বছর হর, উমা ও হরিকে পুজো করা হয়। বাকি দেবতাদের নিয়ে শুক্লা অষ্টমী তিথিতে পুজো করা হয়।
আলোচনায় মুখ্যমন্ত্রী ডাঃ সাহা আরো বলেন, বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য ত্রিপুরার অন্যতম শক্তি। এরজন্য আমরা গর্ববোধ করি। প্রতি বছর এই উৎসবকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন ভাষা, সংস্কৃতি ও সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে সৌহার্দ্য ও ভ্রাতৃত্ববোধ আরো সুদৃঢ় হয়। এই উৎসবে সংস্কৃতির আদান প্রদান ঘটে। সামাজিক বন্ধনও সুদৃঢ় হয়। এবারের খারচি উৎসব ২০২৬ আজ থেকে শুরু হয়ে ২৮ জুলাই পর্যন্ত ৭দিন চলবে। এবারের খারচি মেলার থিম হচ্ছে 'এক পের মা কি নাম'। পরিবেশ সুরক্ষা ও সবুজায়নের বার্তা মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ গ্রহণের জন্য মেলা কমিটিকে ধন্যবাদ জানাই। আজ এখানে প্রায় ২২টি প্রদর্শনী স্টল খোলা হয়েছে। বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এখানে হবে। বিভিন্ন প্রান্তের স্বনামধন্য ও প্রতিভাবান শিল্পীরা এখানে তাদের শৈলী পরিবেশন করবেন। এতে রাজ্যের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য আরো বেশি শক্তিশালী হবে।
মুখ্যমন্ত্রী বলেন, চতুর্দশ দেবতা বাড়ি আজ ত্রিপুরার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় পর্যটন কেন্দ্র। মন্দিরের ঐতিহ্য অক্ষুণ্ন রেখে এখনো পর্যটক ও পুণ্যার্থীদের জন্য আধুনিক সুযোগ সুবিধা দেওয়ার জন্য পর্যটন দপ্তর উদ্যোগ নিয়েছে। দর্শনার্থীদের কাছে এই মন্দিরের আকর্ষণ বৃদ্ধি করতে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। হাজার হাজার পর্যটক এখন এখানে আসছেন। ঐতিহ্যকে সংরক্ষণ করে উন্নয়নকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে সরকার। এভাবে এক ত্রিপুরা, এক ভারত ও শ্রেষ্ঠ ত্রিপুরা, শ্রেষ্ঠ ভারত গড়ে তোলা সম্ভব হবে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিও ঐতিহ্য সংরক্ষণ ও উন্নয়নকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিশিষ্ট অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন খারচি পুজো ও মেলা কমিটির চেয়ারম্যান বিধায়ক রতন চক্রবর্তী, আগরতলা পুর নিগমের মেয়র তথা বিধায়ক দীপক মজুমদার, পর্যটন দপ্তরের সচিব উত্তম কুমার চাকমা, পশ্চিম ত্রিপুরা জেলার জেলাশাসক বিশাল কুমার, পুলিশ সুপার নমিত পাঠক, জিরানিয়া মহকুমা শাসক অনিমেষ ধর, সমাজসেবী রাজেশ ভৌমিক সহ অন্যান্য জনপ্রতিনিধি ও বিশিষ্ট ব্যক্তিগণ।
