আগরতলা।।সন্তানরা যে ভাষাতেই পড়াশোনা করুক বাড়ি ঘরে তাদের সঙ্গে মাতৃ ভাষাতেই কথা বলতে হবে। তাদের মাতৃভাষা লিখতে, পড়তে শেখাতে হবে। মাতৃভাষা না জানলে তারা নিজেদের ইতিহাস, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য থেকে বঞ্চিত হবে।
হাঁপানিয়ায় আন্তর্জাতিক মেলা প্রাঙ্গণের ইন্ডোর হলে আয়োজিত পূর্ব, উত্তরপূর্ব এবং উত্তর অঞ্চলের যৌথ আঞ্চলিক রাজভাষা সম্মেলনের উদ্বোধন করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ অভিভাবকদের প্রতি এই আহ্বান জানান। অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন মুখামন্ত্রী প্রফেসর (ডা) মানিক সাহা, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের প্রতিমন্ত্রী বানডি সঞ্জয় কুমার। মুখ্যমন্ত্রী অনুষ্ঠান মঞ্চে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীকে স্বাগত জানান।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন সাংসদ বিপ্লব কুমার দেব, সাংসদ কৃতিদেবী সিং দেববর্মণ, সাংসদ রাজীব ভট্টাচার্য। অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ছত্রপতি শিবাজী মহারাজের জীবনাদর্শের কথা তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, স্বরাজ মানে নিজের শাসন নয়, স্বরাজ হল স্ব-ভাষা, স্ব-রাজ এবং স্ব-ধর্ম। আমাদের সংবিধান প্রণেতাগণ শিবাজী মহারাজ থেকে অনুপ্রাণিত হয়েই হিন্দি ভাষাকে রাষ্ট্র ভাষার মর্যাদা দিয়েছেন। এই ভাষাকে আরও এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। হিন্দি ভাষার সঙ্গে স্থানীয় ভাষায় কোন লড়াই নেই। লিপি এবং ভাষা এগিয়ে যাওয়ার মাধ্যম। সব ভাষা মিলিয়েই আমাদের দেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে কেন্দ্রীয় সরকার সব ভাষার বিকাশে কাজ করছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, পৃথিবীর উন্নত দেশগুলি তাদের নিজস্ব ভাষাতেই জ্ঞান অর্জন করেছে এবং নিজের দেশকে এগিয়ে নিয়ে গেছে। যেকোন বিষয় মাতৃ ভাষাতেই সবথেকে ভাল বোঝানো যায়। শিশুদের প্রাথমিক শিক্ষা তাদের মাতৃ ভাষাতেই দেওয়ার জন্য কেন্দ্রীয় সরকার কাজ করছে।স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ২০১৪ সালের আগে উত্তর পূর্বাঞ্চল রাজ্যগুলিতে বিভিন্ন বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলি তাদের তৎপরতা চালাত।
নরেন্দ্র মোদি প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেওয়ার পর বিভিন্ন রাজ্যের বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীর সাথে ২১টি সমঝোতা হয়েছে তাতে প্রায় ১১ হাজার যুবক অস্ত্র ছেড়ে সমাজের মূল স্রোতে ফিরে এসেছে। বর্তমানে উত্তর পূর্বাঞ্চলের রাজাগুলিতে শান্তির পরিবেশ তৈরী হয়েছে। এর ফলে উত্তর পূর্বাঞ্চলে এখন পর্যটনের বিরাট সম্ভাবনা তৈরী হয়েছে। বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিনিয়োগ বাড়ছে। উত্তর পূর্বাঞ্চল এখন বিবাদের জায়গার পরিবর্তে বিকাশের জায়গা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তিনি বলেন, উত্তর পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলিতে সমৃদ্ধ সংস্কৃতি রয়েছে। এই অঞ্চলে বিভিন্ন ভাষাভাষীর মানুষ বাস করেন। বিভিন্ন রাজ্যে প্রায় ৫০টি বিভিন্ন ধরণের উৎসবের আয়োজন করা হয়। এই অঞ্চলের ৩০টি নৃত্য শৈলী ভারত বিখ্যাত হয়েছে। উত্তর পূর্বাঞ্চলেরই শচীন দেববর্মণ, রাহুল দেববর্মণ, ড. ভূপেন হাজারিকা, জুবিন গর্গ, ডেনি ডেংজংপা হিন্দি ভাষার মাধ্যমেই ভারত বিখ্যাত হয়েছেন। এই প্রসঙ্গে তিনি মহাত্মা গান্ধী, সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল, রামমোহন রায়, রবীন্দ্র নাথ ঠাকুর, বি আর আম্বেদকর, রাজা গোপালাচারি তাদের অবদানের কথাও তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, দেশ নির্মাণে ও নীতি নির্ধারণে রাষ্ট্রভাষা ও স্থানীয় ভাষা সব থেকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। দেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে রাষ্ট্র ভাষার আরও প্রচার ও প্রসারের জন্য সবাইকে এগিয়ে আসতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আহ্বান জানান। রাজভাষা সম্মেলনের সফল আয়োজনের জন্য তিনি মুখ্যমন্ত্রী প্রফেসর (ডা.) মানিক সাহা এবং রাজ্য সরকারকে অভিনন্দন জানান।
অনুষ্ঠানে মুখ্যমন্ত্রী প্রফেসর (ডা.) মানিক সাহা বলেন, ভারত এক বিশাল ভাষাগত বৈচিত্রোর দেশ এবং হিন্দি ভাষা হলো সেই বৈচিত্র্যকে একসূত্রে বাঁধার এক অনন্য শক্তিশালী মাধ্যম। আঞ্চলিক ভাষার স্বকীয়তা বজায় রেখে হিন্দির জয়যাত্রা এই দর্শনই হলো ভারতের উত্তর পূর্বাঞ্চলের প্রাণ শক্তি। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, আঞ্চলিক ভাষাই আমাদের আত্মপরিচয় ও অন্তরাত্মা। আর সেই পরিচয়ের সাথে হিন্দির মেলবন্ধনই হলো বর্তমান উত্তর পূর্বাঞ্চলের মূল চেতনা এবং আধুনিক ভারতের মূল শক্তি। হিন্দি বর্তমানে বিশ্বের তৃতীয় সর্বাধিক কথিত ভাষা। এই ভাষা সরকার ও জনগণের মধ্যে একটি সংযোগ স্থাপনের এক কার্যকর মাধ্যম।
মুখ্যমন্ত্রী বলেন, প্রধানমন্ত্রীর উদ্যোগে আজ বিশ্বমঞ্চে ভারতীয় ভাষা ও সংস্কৃতির নবজাগরণ ঘটেছে। রাষ্ট্রসংঘ হোক বা জি-২০ শীর্ষ সম্মেলন নিজ ভাষায় বক্তব্য রেখে প্রধানমন্ত্রী ভারতীয় ভাষার মর্যাদা বিশ্ব দরবারে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। এই প্রসঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারী বাজপেয়ীর রাষ্ট্রসংঘে দেওয়া ঐতিহাসিক হিন্দি ভাষণের স্মৃতিও রোমন্থন করেন। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, বর্তমান কেন্দ্রীয় সরকার স্কুল থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত মাতৃভাষায় শিক্ষা প্রদানের উপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। রাজোর জনগণও হিন্দির প্রতি অত্যন্ত শ্রদ্ধাশীল। ত্রিপুরার শিক্ষা ক্ষেত্রেও হিন্দির সাহিত্যচর্চা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে। মুখ্যমন্ত্রী আরও বলেন, হিন্দি ও অন্যান্য আঞ্চলিক ভাষা কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়, বরং প্রযুক্তি বিজ্ঞান ন্যায়বিচার ও প্রশাসনের শক্ত ভিত হওয়া প্রয়োজন। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, হিন্দির প্রসার আঞ্চলিক ভাষার গুরুত্ব কমায় না বরং স্থানীয় ভাষা ও হিন্দি দুটির সহাবস্থানই জাতীয় ঐক্যের শক্ত ভিত্তি। রাজ্যের বর্তমান সরকারও আঞ্চলিক ও জনজাতির ভাষার সংরক্ষণ ও বিকাশে আন্তরিক।
হিন্দি ভাষার শব্দভান্ডার অত্যন্ত সমৃদ্ধ। একটি ভাব প্রকাশের জন্য শত শত শব্দ বিদ্যমান। সংস্কৃতের ঐশ্বর্যপূর্ণ শব্দভান্ডার ও নতুন শব্দ সৃষ্টির ক্ষমতা হিন্দিকে সমৃদ্ধ করেছে। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ভাষার উদ্দেশ্য মানুষের মধ্যে সংযোগ বৃদ্ধি করা, বিভক্ত করা নয়।মুখ্যমন্ত্রী বলেন, রাষ্ট্রভাষার ব্যবহারকে আরও কার্যকর করার পাশাপাশি প্রশিক্ষণ ব্যবস্থাকে আরও কাছাকাছি নিয়ে আসার ক্ষেত্রে এই ধরনের উদ্যোগ বিশেষ সহায়ক হবে। নতুন প্রেরণা ও সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা প্রদান করবে। মুখ্যমন্ত্রী সম্মেলনে উপস্থিত অতিথিদের ত্রিপুরার কৃষ্টি ও সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হওয়ার আহ্বান জানান। তিনি সম্মেলনের সার্বিক সফলতা কামনা করেন। বক্তব্য রাখতে গিয়ে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বানডি সঞ্জয় কুমার বলেন, রাজভাষা ভারতীয় আদর্শকে এক সূত্রে বেঁধেছে। রাজভাষা ভারতকে ঐক্যবদ্ধ করেছে। প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে সরকারি কাজেও রাষ্ট্রভাষা ব্যবহার করা হচ্ছে। যা সহজ ও সবার কাছে গ্রহণ যোগ্য।
তিনি বলেন, হিন্দি ভাষা দেশ বিদেশে থাকা কোটি কোটি ভারতবাসীকে ঐক্যবদ্ধ করে রেখেছে। তবে সবাইকেই তার মাতৃভাষা শিখতে হবে এবং সব ভাষাকে সম্মান জানাতে হবে। এর পাশাপাশি প্রতিটি ভাষাকে সংরক্ষণ করতে হবে। তিনি আশা প্রকাশ করেন এই আয়োজন উত্তর পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলিতে হিন্দি ভাষার প্রচার ও প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেবে।অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন নাগাল্যান্ডের নাগরি লিপি পরিষদের অধিকর্তা ড. বি পি ফিলিপ, ত্রিপুরা বিশ্ববিদ্যালয়ের হিন্দি অধ্যাপিকা প্রফেসর মিলন রাণী জমাতিয়া।
স্বাগত বক্তব্য রাখেন কেন্দ্রীয় রাজভাষা বিভাগের সচিব অংশুলী আর্য। অনুষ্ঠান শুরুর আগে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ ইন্ডোর হল প্রাঙ্গণে বিভিন্ন সংস্থা, ব্যাংক এর স্টলগুলি পরিদর্শন করেন। অনুষ্ঠান মঞ্চে তিনি বিভিন্ন ব্যক্তি ও সংস্থাকে উল্লেখযোগ্য কাজের জন্য ক্ষেত্রীয় রাজভাষা পুরস্কারে পুরস্কৃত করেন। তাছাড়া তিনি কেন্দ্রীয় রাজভাষা বিভাগ প্রকাশিত কয়েকটি বইয়ের আবরণ উন্মোচন করেন।আজ বিকেলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ আগরতলা এমবিবি বিমানবন্দরে পৌঁছালে তাঁকে স্বাগত জানান মুখ্যমন্ত্রী প্রফেসর (ডা.) মানিক সাহা, আগরতলা পুরনিগমের মেয়র তথা বিধায়ক দীপক মজুমদার, সাংসদ বিপ্লব কুমার দেব, সাংসদ রাজীব ভট্টাচার্য, মুখ্যসচিব জে কে সিনহা, রাজ্য পুলিশের মহানির্দেশক অনুরাগ, জেলাশাসক ডা. বিশাল কুমার এবং এসপি নমিত পাঠক।
আজ রাতেই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজ্য ত্যাগ করেন। এমবিবি বিমানবন্দরে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীকে বিদায় জানান মুখ্যমন্ত্রী প্রফেসর (ডা) মানিক সাহা, আগরতলা পুরনিগমের মেয়র তথ্য বিধায়ক দীপক মজুমদার, সাংসদ বিপ্লব কুমার দেব, সাংসদ রাজীব ভট্টাচার্য, সাংসদ কৃতিদেবী সিং দেববর্মণ, মুখ্যসচিব জে কে সিনহা, রাজ্য পুলিশের মহানির্দেশক অনুরাগ, জেলাশাসক ডা বিশাল কুমার এবং এসপি নমিত পাঠক।
