আগরতলা: বিধানসভায় ২০২৬–২৭ অর্থবছরের জন্য ৩৪,২১২.৩১ কোটি টাকার বাজেট পেশ করলেন রাজ্যের অর্থমন্ত্রী প্রণজিৎ সিংহ রায়। এই বাজেট গত বছরের তুলনায় প্রায় ৫.৫২ শতাংশ প্রবৃদ্ধির ইঙ্গিত বহন করছে। তবে সামগ্রিক ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ায় নতুন বাজেটে ২৪০.৭২ কোটি টাকার ঘাটতির প্রাক্কলন করা হয়েছে।

বাজেট নথিপত্র অনুযায়ী, আগামী অর্থবছরে রাজ্যের মোট প্রাপ্তি ৩৩,৯৭১.৫৯ কোটি টাকা হবে বলে অনুমান করা হয়েছে। অন্যদিকে মোট ব্যয়ের পরিমাণ ধরা হয়েছে ৩৪,২১২.৩১ কোটি টাকা। এর ফলেই প্রায় ২৪০.৭২ কোটি টাকার ঘাটতি তৈরি হয়েছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, রাজ্যের রাজস্ব প্রাপ্তি ২৬,৮৮১.৯৯ কোটি টাকা হবে বলে অনুমান করা হয়েছে, যেখানে রাজস্ব ব্যয় ধরা হয়েছে ২৫,২৬৬.৩৯ কোটি টাকা।

এর ফলে ১,৬১৫.৬০ কোটি টাকার রাজস্ব উদ্বৃত্ত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। অন্যদিকে মূলধন হিসাব বা ক্যাপিটাল অ্যাকাউন্টের ক্ষেত্রে রাজ্য সরকার ঋণ এবং অন্যান্য উৎস—যার মধ্যে পাবলিক অ্যাকাউন্ট ও প্রারম্ভিক স্থিতি অন্তর্ভুক্ত—থেকে ৭,০৮৯.৬০ কোটি টাকা প্রাপ্তির আশা করছে। মূলধন ব্যয় ধরা হয়েছে ৮,৯৪৫.৯২ কোটি টাকা, যার ফলে ১,৮৫৬.৩২ কোটি টাকার মূলধন ঘাটতি সৃষ্টি হয়েছে। বাজেট বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, গত কয়েক বছরে ত্রিপুরার বাজেটের আকার ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।

২০১৮ সালে যেখানে রাজ্যের বাজেটের আকার ছিল প্রায় ১৫,০০০ কোটি টাকা, বর্তমানে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৪,২১২ কোটি টাকায়। অর্থনীতিবিদদের মতে, এটি রাজ্যের জনব্যয় এবং উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের উল্লেখযোগ্য সম্প্রসারণের প্রতিফলন। সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বাজেটের এই বর্ধিত বরাদ্দ রাজ্যের অবকাঠামো উন্নয়ন, সমাজকল্যাণমূলক প্রকল্প, ডিজিটাল শাসন ব্যবস্থার সম্প্রসারণ এবং রাজ্যজুড়ে জনসেবা ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করতে সহায়ক হবে। সরকারি কর্মকর্তাদের মতে, নতুন বাজেটটি উন্নয়নমূলক ব্যয় এবং আর্থিক শৃঙ্খলার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার একটি প্রচেষ্টা। যদিও এতে প্রায় ২৪০ কোটি টাকার মাঝারি ঘাটতির প্রাক্কলন রয়েছে, তবুও সামগ্রিকভাবে এটি রাজ্যের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়নকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যে প্রণীত হয়েছে।

আজ পেশ করা বাজেটটি নানা চমকপ্রদ প্রতিশ্রুতিতে পরিপূর্ণ; যেমন—গত অর্থবছরের বাজেটের তুলনায় মূলধনী ব্যয়ে ১৩.১৯ শতাংশের মতো বিশাল বৃদ্ধি ঘটানো হয়েছে। যদিও প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী রাজ্য সরকারের সামগ্রিক ঋণের পরিমাণ ২১ হাজার কোটি টাকারও বেশি, তবুও বাজেটে নতুন কোনো কর প্রস্তাব রাখা হয়নি। এর পাশাপাশি এমন জল্পনাও শোনা যাচ্ছে যে, ঋণের বোঝা আংশিকভাবে লাঘব করার লক্ষ্যে ১লা এপ্রিল থেকে কার্যকর হতে যাওয়া ১৬তম অর্থ কমিশনের বরাদ্দ থেকে অগ্রিম অর্থ উত্তোলনের পথ বেছে নেওয়া হতে পারে।

বাজেট নথিপত্রের সাথে প্রদত্ত বিবৃতি অনুযায়ী, স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দের পরিমাণ ২৫.২৯ শতাংশের মতো বিপুল হারে বৃদ্ধি পেয়েছে; যা রাজ্যে স্বাস্থ্য পরিকাঠামোর উন্নয়ন ও আধুনিকায়নের প্রতি সরকারের অগ্রাধিকারকেই প্রতিফলিত করে। কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা খাতে বরাদ্দের বৃদ্ধি ঘটেছে মাত্র ৪.৪৩ শতাংশ। এর অর্থ হলো, রাজ্যে স্কুল বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং শিক্ষকের তীব্র ঘাটতির মধ্য দিয়ে স্কুল শিক্ষার যে শোচনীয় অবস্থা বর্তমানে ফুটে উঠেছে, নতুন অর্থবছরেও সেই অবস্থারই পুনরাবৃত্তি ঘটবে। এ ছাড়াও, বাজেট প্রস্তাবনা অনুযায়ী রাজ্যে বিপুল সংখ্যক নতুন প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হবে।

এই প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে ৬০টি নতুন বাজার (বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকাগুলোতে), মোহনপুরে একটি ‘কৃষি খামার যন্ত্রপাতি প্রচার ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্র’, আগরতলার অভয়নগর এলাকার পশু হাসপাতালে পোষা প্রাণীদের জন্য একটি ‘ক্রিটিক্যাল কেয়ার ইউনিট’, আদিবাসীদের উৎপাদিত পণ্যসামগ্রী বিক্রয়ের জন্য ৩০টি নতুন বাজার শেড, ‘ত্রিপুরা সরকারি কারিগরি বিশ্ববিদ্যালয়’, ‘ত্রিপুরা সরকারি মহিলা বিশ্ববিদ্যালয়’ এবং অন্যান্য বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *