আগরতলা: জাতি জনজাতি অংশের মানুষের মিলিত প্রচেষ্টায় রাজ্যের উন্নয়ন ত্বরান্বিত করা সম্ভব। এর মাধ্যমেই এক ত্রিপুরা শ্রেষ্ঠ ত্রিপুরা গড়ে তোলা সম্ভব হবে। পূর্ণরাজ্য দিবস পালনের মূল লক্ষ্যই হলো রাজ্যের মানুষের আর্থ সামাজিক উন্নয়নকে সঠিকপথে চালিত করা। আর রাজ্যের উন্নয়নকে সচল রাখতে সর্বত্র শান্তি সম্প্রীতি বজায় রাখাই শেষ কথা।

                            আজ আগরতলার রবীন্দ্র শতবার্ষিকী ভবনে ত্রিপুরা পূর্ণরাজ্য দিবস উদযাপন অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করে একথা বলেন মুখ্যমন্ত্রী প্রফেসর ডাঃ মানিক সাহা।
                        
অনুষ্ঠানে আলোচনা করতে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রী ডাঃ সাহা ত্রিপুরা পূর্ণরাজ্য দিবস উদযাপন উপলক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির প্রেরিত শুভেচ্ছা বার্তা পড়ে শোনান। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, প্রধানমন্ত্রী ২০৪৭ সালের মধ্যে বিকশিত ও আত্মনির্ভর ভারত গড়ার ডাক দিয়েছেন। রাজ্য সরকারও সেই দিশাতে কাজ করে চলেছে।
              
মুখ্যমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে ত্রিপুরা পূর্ণরাজ্য দিবসের প্রেক্ষাপট নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে বলেন, ১৯৪৭ সালের ১৭ মে মহারাজা বীরবিক্রম মাণিক্যের প্রয়াণের পর রাজ্য পরিচালনার জন্য মহারাণী কাঞ্চনপ্রভা দেবীর নেতৃত্বে কাউন্সিল অব রিজেন্সি গঠিত হয়। ১৩ আগস্ট মহারাণী কাঞ্চনপ্রভা দেবী ত্রিপুরা ভারত ইউনিয়নের যোগদানের সম্মতিপত্রে স্বাক্ষর করেন। ভারত সরকারের পরামর্শক্রমে ১৯৪৮ সালের ১২ জানুয়ারি কাউন্সিল অব রিজেন্সি ভেঙ্গে দিয়ে এককভাবে মহারাণী কাঞ্চনপ্রভা দেবীকে রিজেন্সি নিযুক্ত করা হয়। এরপর ১৯৪৯ সালের ১৫ অক্টোবর পর্যন্ত মহারাণী কাঞ্চনপ্রভা দেবী একক রাজ প্রতিনিধি হিসেবে ত্রিপুরার শাসন পরিচালনা করতে থাকেন। ১৯৪৯ সালের ৯ সেপ্টেম্বর দিল্লিতে মহারাণী কাঞ্চনপ্রভা দেবী রিজেন্ট হিসেবে ত্রিপুরার ভারতভুক্তি সম্পর্কিত দলিলে স্বাক্ষর করেন। অবশেষে ১৯৪৯ সালের ১৫ অক্টোবর ত্রিপুরা আনুষ্ঠানিকভাবে ভারত ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত হয়।

                           মুখ্যমন্ত্রী পূর্ণরাজ্য দিবস পালনের তাৎপর্য বিষয়ে বলেন, ১৯৭২ সালের ২১ জানুয়ারি ত্রিপুরা পূর্ণরাজ্য হিসেবে মর্যাদা লাভ করে। ত্রিপুরা পূর্ণরাজ্যের মর্যাদা প্রাপ্তির ক্ষেত্রে যে সকল ব্যক্তি ও নাগরিক অসামান্য অবদান রেখেছেন মুখ্যমন্ত্রী তাদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ব্যক্ত করেন।
                        
ডাঃ সাহা বলেন, ২০১৮ সালে ত্রিপুরায় নতুন সরকার গঠন হওয়ার পর রাজ্যে কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, শিল্প পরিকাঠামো উন্নয়ন, মহিলাদের ক্ষমতায়ন, জনজীবনে নিরাপত্তা প্রদান ও স্বনির্ভরতা অর্জন প্রতিটি ক্ষেত্রেই ত্রিপুরা আজ দেশের মধ্যে অন্যতম রাজ্য হিসেবে পরিগণিত হচ্ছে। জি.এস.ডি.পি.-র ক্ষেত্রেও ত্রিপুরা উত্তর পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলির মধ্যে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে। আজ ত্রিপুরা দেশের মধ্যে একমাত্র ডিজিটাল রাজ্য হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে। উন্নয়নমূলক কাজগুলির সঠিক বাস্তবায়নের জন্য রাজ্য বিভিন্ন স্তরে ৩৪৭টি পুরস্কার লাভ করেছে। ডিরেগুলেশনে রাজ্য প্রথম পুরস্কার পেয়েছে। গত ২০ বছরের মধ্যে আইন শৃঙ্খলা বর্তমানে অনেকটাই ভালো অবস্থানে রয়েছে। 
                     
মুখ্যমন্ত্রী বক্তব্যে আরও বলেন, রাজ্যের মহিলাদের আত্মনির্ভরতার পথে চালিত করার ক্ষেত্রে বর্তমান সরকার অনেকটাই সফল হয়েছে। স্বসহায়ক দলগুলির মাধ্যমে মহিলাদের আর্থসামাজিক মানোন্নয়নে যে পদক্ষেপ সরকারের পক্ষ থেকে নেওয়া হয়েছে তার ফলেই বর্তমানে রাজ্যে ১ লক্ষ ৮ হাজার লাখপতি দিদি রয়েছেন। রাজ্যে বর্তমানে ৫৪ হাজার ৩২৩টি মহিলা স্বনির্ভর দল সাফল্যের সাথে কাজ করছে। রাজ্যের জনজাতিদের উন্নয়নেও রাজ্য সরকার নির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা রেখে কাজ করছে। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ভালো কাজ করতে গেলে ত্রুটি কিছু ঘটবেই, তা সত্বেও বর্তমান সরকার দায়বদ্ধতার মধ্য দিয়ে রাজ্যের মানুষের জন্য সার্বিক উন্নয়নকে বাস্তবায়ন করতে বদ্ধপরিকর। অনুষ্ঠানে মুখ্যমন্ত্রী পূর্ণরাজ্য দিবস উপলক্ষ্যে একটি ফোল্ডারের আবরণ উন্মোচন করেন। অনুষ্ঠানে তথ্য ও সংস্কৃতি দপ্তরের পক্ষ থেকে রাজ্যের উন্নয়ন নিয়ে একটি স্বল্পদৈর্ঘ্যের তথ্যচিত্র প্রদর্শিত হয়।

                              অনুষ্ঠানে বিশিষ্ট অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কৃষি ও কৃষক কল্যাণ মন্ত্রী রতনলাল নাথ, পর্যটন মন্ত্রী সুশান্ত চৌধুরী, উচ্চশিক্ষা মন্ত্রী কিশোর বর্মন, মুখ্যসচিব জে.কে. সিনহা পুলিশের মহানির্দেশক অনুরাগ, তথ্য ও সংস্কৃতি দপ্তরের সচিব ড. প্রদীপ কুমার চক্রবর্তী, অধিকর্তা বিম্বিসার ভট্টাচার্য সহ বিভিন্ন দপ্তরের সচিব, অধিকর্তাগণ।
                      
উল্লেখ্য, ত্রিপুরা পূর্ণরাজ্য দিবস উপলক্ষ্যে এবছরও সমাজের বিশিষ্টজনদের বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবদান রাখার জন্য ৬ জনকে রাজ্য নাগরিক পুরস্কার এবং ১১ জনকে স্টেটহুড ডে অ্যাওয়ার্ড প্রদান করা হয়। পুরস্কার প্রাপকদের হাতে পুরস্কারগুলি তুলে দেন মুখ্যমন্ত্রী সহ অন্যান্য অতিথিগণ। রাজ্য নাগরিক পুরস্কারের মধ্যে ত্রিপুরা বিভূষণ সম্মান প্রয়াত শিক্ষাবিদ ধীরেন্দ্র চন্দ্র দত্তকে (মরণোত্তর), ত্রিপুরা ভূষণ সম্মান রাজ্য বিধানসভার প্রাক্তন অধ্যক্ষ প্রয়াত বিশ্ববন্ধু সেনকে (মরণোত্তর) এবং বিশিষ্ট চিত্রনাট্য লেখক বিপ্লব গোস্বামীকে, শচীন দেববর্মণ স্মৃতি রাজ্য সম্মান বিশিষ্ট লোকশিল্পী সূর্য কুমার দেববর্মাকে (সদাগর), মহারাণী কাঞ্চনপ্রভা দেবী স্মৃতি রাজ্য সম্মান কামালঘাটের চম্পা দাসকে এবং বিজ্ঞান ও পরিবেশ সংক্রান্ত কার্যাবলির জন্য রাজ্য পুরস্কার বীরবিক্রম মেমোরিয়াল কলেজের অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর এবং এইচ.ও.ডি. ড. অরিজিৎ দাসকে প্রদান করা হয়।
                        
এছাড়াও অনুষ্ঠানে স্টেটহুড ডে অ্যাওয়ার্ডের মধ্যে গুড সিটিজেন অ্যাওয়ার্ড পূর্ব প্রতাপগড়ের গৌতম দাসকে, শ্রেষ্ঠ স্টার্টআপ এন্ট্রাপ্রেনার হিসেবে নাগিছড়ার আটকালাপা বায়োটেকনোলজি এল.এল.পি.-কে, কৃষি উদ্যান ক্ষেত্রে শ্রেষ্ঠ এন্ট্রাপ্রেনার হিসেবে সালেমার সিম্বুকচাক ভিলেজের ধনবাবু হালামকে, মৎস্যক্ষেত্রে শ্রেষ্ঠ এন্ট্রাপ্রেনার হিসেবে সিপাহীজলার মোহনভোগের কৃষ্ণ দেববর্মাকে, অ্যানিমেল হাসবেন্ডারি ক্ষেত্রে শ্রেষ্ঠ এন্ট্রাপ্রেনার হিসেবে বিশ্রামগঞ্জের রতন দেবনাথকে, হস্ততাঁত ও হস্তকারু/ মৌমাছি পালন ক্ষেত্রে শ্রেষ্ঠ এন্ট্রাপ্রেনার হিসেবে তেলিয়ামুড়ার উত্তম কুমার দাসকে, ইন্ডাস্ট্রিয়াল এন্টারপ্রাইজের ক্ষেত্রে শ্রেষ্ঠ এন্ট্রাপ্রেনার হিসেবে ফটিকরায়ের কাঞ্চনবাড়ির দীপক দত্তকে, শ্রেষ্ঠ মোবাইল অ্যাপের জন্য পূর্ব যোগেন্দ্রনগরের সত্যব্রত বিশ্বাসকে, শ্রেষ্ঠ কো-অপারেটিভসোসাইটি হিসেবে গোমতী জেলার তুলামুড়া প্যাকস লিমিটেডকে, শ্রেষ্ঠ শিক্ষাবিদ হিসেবে বিলোনীয়ার লক্ষ্মণ মালাকারকে, শ্রেষ্ঠ ক্রীড়াবিদ হিসেবে নতুননগরের শ্রীপর্ণা দেবনাথকে স্টেটহুড ডে অ্যাওয়ার্ড প্রদান করা হয়।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *